আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল সামলাতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে প্রস্তুতি জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। এবারের ঈদে টানা ৯ দিনের সরকারি ছুটির ফলে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ফেরিঘাটের সংকট, পুরনো লঞ্চ, দালালদের টিকিট প্রতারণা, বেপরোয়া কুলি ও ফেরিতে অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে জনমনে শঙ্কা কাটছে না।
বিআইডাব্লিউটিসি সূত্র জানায়, নৌরুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭টি ফেরি সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। দ্রুত মেরামতের জন্য পাটুরিয়ার ভাসমান কারখানা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও যাত্রী চাপ সামলাতে ৩৩টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ২০টি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে এবং ১৩টি আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে চলবে।
তবে এতো প্রস্তুতির পরও যাত্রীদের আশঙ্কা কাটছে না। দৌলতদিয়া ঘাটে বর্তমানে সাতটির মধ্যে চারটি ফেরিঘাট বন্ধ রয়েছে, যার ফলে তিনটি চালু ঘাটে প্রচণ্ড চাপ পড়বে। নদীর পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঘাটের পকেটপথ ঢালু হয়ে গেছে, যা যানবাহনের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
অপরদিকে নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর বেশিরভাগই ৪০-৪৫ বছর পুরনো, অনেকগুলো মেরামত করা হলেও ভেতরের ইঞ্জিনসহ নানা সরঞ্জাম জোড়াতালি দেওয়া। অধিকাংশ লঞ্চে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, ফাস্টএইড কিট এবং জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম নেই।
এছাড়া, দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরির টিকিট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ঈদের সময় ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকলেও দালাল চক্র ভুয়া টিকিট বিক্রির ফাঁদ পাতে, যা যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে। বেপরোয়া কুলিদের দৌরাত্ম্যও এক উদ্বেগের কারণ। লঞ্চঘাট ও বাস টার্মিনালে যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পকেটমারের মতো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, দৌলতদিয়া ঘাট সংলগ্ন মহাসড়কে উল্টোপথে গাড়ি চলাচল এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঈদের সময় এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
অপরদিকে, রাতে চলাচলকারী ফেরিগুলোতে নিরাপত্তার অভাবের সুযোগ নিয়ে কিছু চক্র জুয়ার আসর বসায় ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
লঞ্চ যাত্রী শরিফুল হাসান বলেন, দীর্ঘ ১৩ বছর এই নৌপথ ব্যবহার করছি, আগে না ভোগান্তিতে পড়লেও পদ্মা সেতু চালুর পর এ নৌপথে কোন ভোগান্তি নেই। ঈদের সময় এ নৌপথে যাত্রীর চাপ বাড়বে। লঞ্চঘাটের ঢালু পথে উঠানামার ক্ষেত্রে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাকচালক আনোয়ার মোল্লা বলেন, সংযোগ সড়ক উঁচু হওয়ায় মূল সড়কে উঠতে পারিনি, স্থানীয় শ্রমিকদের টাকা দিয়ে উঠতে হয়েছে। ঈদের আগে মেরামত না হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।
বাসচালক শামিম বলেন, সংযোগ সড়কের দুরবস্থার কারণে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
যাত্রী নুরু মিয়া বলেন, ধুলোবালি, যানজট ও নানাবিধ সমস্যায় ভোগান্তি লেগেই থাকে। ঈদের সময় ঘাট মেরামত ও ফেরির সংখ্যা বাড়ানো দরকার।
ফেরি চালকরা বলেন, পদ্মায় ডুবোচরের কারণে ফেরি চলাচলে ঝুঁকি থাকায় দৌলতদিয়া ৩ ও ৭ নম্বর ঘাটে একসঙ্গে দুটি ফেরি চলতে পারে না, যা যানজট সৃষ্টি করতে পারে।
বিআইডব্লিউটিসির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ঈদে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার নির্বিঘ্ন করতে ১৭টি ফেরি ও ২২টি লঞ্চ সার্বক্ষণিক চলবে। এছাড়াও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঘাটের নিরাপত্তায় চারস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি নৌপুলিশ ও সাদা পোশাকের টহল দল কাজ করবে। চাঁদাবাজি ও দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি যানজট নিরসনে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, ঈদের আগে ও পরে তিন দিন ভারী যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী বহন রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
যাত্রী ও চালকদের দাবি, সংযোগ সড়ক ও ঘাট দ্রুত মেরামত না হলে ঈদযাত্রা চরম দুর্ভোগে পরিণত হতে পারে। যদিও প্রশাসন বলছে, সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে।