ঢাকা শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

বাংলা ভাষায় ঈদের কবিতার সূচনা

মো. রবিন ইসলাম
বাংলা ভাষায় ঈদের কবিতার সূচনা

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। মুসলমানরা এদেশের যখন আগমন করেন, তখন এই অঞ্চল বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। মুসলমানগণ ইরান, তুরস্ক, আরব দেশ থেকে এদেশে গমন করেন। তবে যেখান থেকে আসুন না কেন, অথবা এদেশেই উদ্ভূত হোন না কেন, মধ্যযুগেই মুসলমানরা বাঙালি হয়ে উঠেছিল এবং তাদের মাতৃভাষা হয়ে উঠেছিল বাংলা। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে পাশাপাশি বাস করছিলেন। সাহিত্য চর্চায়ও লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু শাহ মুহম্মদ সগীর থেকে খোন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকী বা মীর মশাররফ হোসেনের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত মধ্যযুগের মুসলিম রচিত যে-সাহিত্য, তাতে রোমান্স, কল্পকথা, ইসলামী পুরাণ, লোকপুরাণ, ইসলামের ইতিহাস, আরবি-ফারসি-হিন্দি কাব্যগ্রন্থের তর্জমা বা ভাবানুসরণই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। লোকাচার, জীবনাচার, ধর্মাচার অর্থাৎ বাঙালি-মুসলমানদের প্রাত্যহ-আচরিত জীবন তারও খুব একটা প্রশ্রয় পায়নি। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আধুনিককাল পর্যন্ত- যখন কেবল আর স্বভাব-কবিতা লেখা হচ্ছে না চিন্তার চর্চাও শুরু হয়েছে। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর দুটি ঈদের আগমন ঘটে বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ নিয়ে।ঈদ ধর্মীয় উৎসব তো বটেই, তবে আজ সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য কবি, সাহিত্যক ঈদ ঘিরে রচনা করেন অসংখ্য গান, কবিতা, প্রবন্ধ...। তার মধ্যে অন্যতম বাংলার আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ঈদ নিয়ে রচনা করেছেন কবিতা,গান ও গজল, নাটক। নজরুলের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আরও অনেক কবি, সাহিত্যিক ঈদের কবিতা, গান, প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তবে নজরুলই তাদের মধ্যে অন্যতম। ঈদকে ঘিরে প্রতিবছরই রচিত হচ্ছে গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক,গল্প ইত্যাদি। সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৮০-১৯৫৬) কবিতাগ্রন্থ ডালির দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬৬) ‘ঈদ’ নামে দুটি কবিতা আছে: প্রথমটির প্রথম ছত্র ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ এবং দ্বিতীয়টির প্রথম ছত্র ‘বিশ্ব জুড়ে মুসলিমের গৃহে গৃহে আজি’। ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ পঙক্তি সংবলিত ‘ঈদ’ কবিতাটির নিচে কবির টীকা আমাদের জন্য খুব মূল্যবান: ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বর্ষ নবনূরের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।’ প্রথম এই ঈদের কবিতার প্রথম দুটি স্তবক উদ্ধৃত করছি:

কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে/তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে/রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে/ আজ কি হর্ষ ভরে। ১৯০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী-সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫- পর পর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে, ‘এই অর্থে অন্তত যে প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রধান সাহিত্যিক আবিষ্কার ও ফসল সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে এবং কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মিসেস আর, এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২)। এই তিনজন লেখকই ‘নবনূরে’ ঈদ-সংক্রান্ত কবিতা বা গদ্য লিখেছেন। ‘নবনূর’- এর পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতা।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত (১৮৬৯-১৯২৭) ‘নবনূর’-এর ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘ঈদজ্জোহা’ নামক প্রবন্ধ। ‘নবনূর’ এর পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ-সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দু কুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং মিসেস আর এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ গদ্যপ্রবন্ধ। ‘ঈদ আবাহন’ এই একই নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন: একটি তাঁর অশ্রুমালা (১৩১১) গ্রন্থর্ভূত, অন্যটি তাঁর অমিয়ধারা (১৩২৯) গ্রন্থর্ভূত। মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩) ‘ঈদ’ শেখ ফজলল করিম (১৮৮২-১৯৩৬) ‘ঈদ’ নজরুলের অব্যবহিত দুই পূর্বসূরি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) ও গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) ও ঈদ বিষয়ক কবিতা লিখেছেন।

নজরুল ইসলাম অবিসংবাদীভাবে বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দ তথা ‘মুসলমানী ঢং’-এর প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে তাঁর নানামুখী উদ্যমের মধ্যে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান-ব্যবহারিক দিকগুলোও রয়েছে। ঈদ তার মধ্যে একটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এই দুই ঈদ নিয়েই নজরুল কবিতা গান-নাটক-গীতিবিচিত্রা লিখেছেন। এখানে তার একটি তালিকা দেওয়া যেতে পারে।

কৃষকের ঈদ। সাপ্তাহিক ‘কৃষক’, ঈদ-সংখ্যা ১৯৪১। ঈদ মোবারক। রচনা: কলিকাতা, ১৯ চৈত্র ১৩৩৩। জিঞ্জির। জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ, ঈদের চাঁদ, সর্বহারা, বকরীদ। কোরবানি ‘মোসলেম ভারত’, ভাদ্র ১৩২৭। অগ্নি-বীণা। শহীদী ঈদ। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’। খুশির ঈদ (ওমন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদসহ আরও বেশকয়েকটি কবিতা লিখেছেন নজরুল।

মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩) উনিশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ তিন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রতিভাবান লেখকের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নজরুল এবং একা তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকখানি। ইসলামী ঐতিহ্যের ব্যবহারে তার একটি পরিষ্কার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা- মুসলমানদের এই প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব নিয়েই কবিতা লিখেছেন নজরুল। এবং যথারীতি ঈদ নিয়ে এতোকাল যে কবিতা গান লেখা হয়েছে, নজরুল তাকে অনায়াসে অতিক্রম করেছেন, ঈদ-সম্পৃক্ত তাঁর কবিতা- গান-নাটকে তাঁরই করাঙ্গুলির ছাপ স্পষ্ট মুদ্রিত। শুধু তাই নয়, বাঙালি-মুসলমানকে তা নতুনভাবে উজ্জীবিত-উদ্বোধিত করেছে এবং আজো করে।

নজরুল ইসলামের পরবর্তীকালে ঈদের কবিতাণ্ডগান লিখেছেন সিকানদার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনোমোহন বর্মণ প্রমুখ অনেক কবি। ফররুখ আহমদ তাঁর ‘ঈদের স্বপ্ন’ (কাফেলা) সনেটে ঈদের চাঁদ দেখে তাঁর স্বপ্নজগতেই প্রস্থান করেন।

শামসুর রাহমান তাঁর একটি কবিতায় শৈশবের ঈদের আনন্দের বর্ণনা দিয়েছেন। শহীদ কাদরীর কবিতায় ‘সুনীল ঈদগা’ দেখা দেয় প্রতীকের মতো। এমনিভাবে ঈদের আনন্দ-বেদনা মূর্ত হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলী থেকে শহীদ কাদরী বা তাঁর পরবর্তীদের রচনায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত