মাস্টার খোরশেদ আপাদমস্তক একজন মেধাবী মানুষ। বাল্যকালে শিশু শ্রেণিতে পড়াকালীন শিক্ষকরা বাল্যশিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে কিছু নীতি বাক্য উচ্চস্বরে পাঠ করে শিশুদের মুখস্থ করাতেন। যেমন-
পড়া-লেখা করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। জ্ঞানই শক্তি। মিথ্যা বলা মহাপাপ। সদা সত্য কথা বলিবে। সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। দীনে দয়া করো। গুরুজনে করো নতি প্রভৃতি। মাস্টার খোরশেদ শিশু শ্রেণি থেকে এই বাক্যগুলো শিক্ষকের মুখে শুনে শুধু মুখস্থই করেনি, মনে-প্রাণে ধারণও করেছিল। পরবর্তীতে হৃদয়ে লালন করতে থাকে। শিশুর কচি মনে স্বপ্নের বীজ বোনা সহজ। হয়তো এই কারণে ইশ্বর বাবু উক্তিগুলো বাল্যশিক্ষা বইতে সংযোজন করেছিলেন। খোরশেদ পড়ালেখায় যেমন পারঙ্গম, আচার ব্যবহারও ছিল মার্জিত। শিক্ষকরা তার মেধার প্রশংসায় সদা পঞ্চমুখ থাকতেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে শিক্ষকদের প্রশংসার মুখ রেখেছিল। শুরুতে আপাদমস্তক মেধবী বলার হেতু হচ্ছে- তার হাতের লেখা যেমন সুন্দর, খেলার মাঠে ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করে, ফুটবলে সজোরে কিক মেরে, প্রতিপক্ষের গোল সীমানায় বল পাঠিয়ে দিতো। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে রবিন্দ্র সংগীত আর নজরুলগীতি পরিবেশন করে ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক-শিক্ষিকার নজর কেড়েছিল। এসএসসি পরীক্ষায় স্টার মার্ক নিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে নাম করা একটি কলেজে ভর্তি হয়। দুই-তিনটি টিউশন করে কলেজে নিজের অধ্যয়নের খরচ চুকিয়ে বাড়িতে মায়ের হাতেও কিছু দিতে পারতো। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর দীর্ঘকালের লালিত স্বপ্ন পূরণে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১ম স্বপ্নের অকালমৃত্যু : মাস দেড়েক রাত-দিন পড়াশুনা করে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে ফরম নিতে যায়। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা নবীনদের স্বাগত জানিয়ে স্ব-স্ব দলের লিফলেট বিতরণ করছে। ডোরাকাটা দলের এক কর্মী খোরশেদকে একটি লিফলেট হাতে দিয়ে ক্যাম্পাসে স্বাগত জানান। খোরশেদও তার কাছে জেনে নেয়, প্রশাসনিক ভবনটি কোন দিকে। ডোরাকাটা দলের কর্মীটি তার বাড়ি কোথায়, কোন কলেজ থেকে ইন্টার পাস করেছে ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে করতে তার সাথে কিয়দ্দূর হেঁটে প্রশাসনিক ভবনটি দেখিয়ে দেয়। চক্রমক্র দলের এক কর্মী দেখল ডোরাকাটা দলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে নবীনদের দলে টানার চেষ্টা করছে। সে ঘটনা তার দলের বড় ভাইদের জানাল। মুহূর্তেই চক্রমক্র দলের শ’দুয়েক নেতাকর্মী হাতে হকিস্টিক, লাঠি, রামদা ইত্যাদি নিয়ে জড়ো হয়ে মিছিল শুরু করে। ধাওয়া করে ডোরাকাটা দলের কর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করল। ডোরাকাটা দলের কর্মীরা ক্যাম্পাসের বাইরে পুনরায় সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে মিশ্রবর্ণ দল তাদের শক্তিমত্তা জানান দিতে ক্যাম্পাসে বড়সড় একটি মিছিল বের করল। শুরু হলো ত্রিমুখী লড়াই। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, স্লোগান পাল্টা স্লোগানে ও ককটেলের বিকট শব্দে শান্ত ক্যাম্পাসে আকস্মিক অরাজকতা নেমে আসল। খোরশেদ একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অবলোকন করল, ক্যাম্পাসে ত্রিমুখী যুদ্ধের ডামাডোল বাজলেও বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হচ্ছে, প্রশাসনিক কাজ ঠিকঠাক চলছে। তার কাছে অরাজকতা মনে হলেও অন্যদের জন্য মামুলি ব্যাপার। চক্রমক্র দলের নেতাকর্মীরা ডোরাকাটা দল আর মিশ্রবর্ণ দলের কর্মীদের ক্যাম্পাস ছাড়া করে এবং এই ক্যাম্পাসের মাটি, চক্রমক্র দলের ঘাঁটি স্লোগান দিয়ে বিজয়ের বেশে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছে। মিছিল থেকে একজন খোরশেদকে দেখিয়ে বলল, এই ছেলেটিকে ডোরাকাটা দলের কর্মীর সাথে দেখা গেছে। সাথে সাথে ৮-১০ জন হকিস্টিকধারী তার কাছে আসল। তার হাতে ডোরাকাটা দলের লিফলেট দেখে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে রক্তাক্ত করে বলল, এই ক্যাম্পাসে চক্রমক্র দলের আদর্শের সৈনিক ছাড়া অন্য কোনো দলের আদর্শচর্চির স্থান নেই। খোরশেদ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে গিয়ে, ভর্তি হলো মেডিকেল কলেজে। তবে পড়ালেখা করার জন্য নয়, চিকিৎসা নিতে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে তীব্র ব্যথায় ছটফট করতে করতে ভাবছে, হঠাৎ কী হয়ে গেল। হাসপাতালের বেড ছাড়ার পর জীবনে কখনো ফেতনা-ফ্যাসাদে না জড়ানো স্বপ্নচারী ছেলটি তাওবা-তিল্লা করে বাড়ির উদ্দেশে বাসে উঠলো। আর সিদ্বান্ত নিলো, কিয়ামত পর্যন্ত কোনো ইউনিভার্সিটির মাটিতে পা দিবে না। বাড়িতে গিয়ে এলাকার একটি কলেজে ভর্তি হলো। এভাবে ট্রাক চালক পিতার একজন অদম্য মেধাবী ছেলের ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে স্বপ্নময় ক্যাম্পাসে মুক্তমনে বিচরণ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের অকাল মৃত্যু ঘটল। নিহত স্বপ্নটি দীর্ঘশ্বাস আর সজল নয়নে হৃদয়ের এক কোণায় সমাহিত হলো। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর অতিক্রান্তেও কোনো ভার্সিটির ভর্তি বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লে খোরশেদের শরীরে হকিস্টিকের আঘাতের বিষ-ব্যথা উতলে ওঠে। মনে হয় তার হৃদয়ে সমাহিত নিহত স্বপ্নটির কবর আযাব হচ্ছে!
দ্বিতীয় স্বপ্নের মৃত্যু : স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন পত্রিকার পাতায় ‘নাজির’ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করে। যথারীতি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়। নিয়োগ দিবে চারজন। মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হলো ১৬ জন। ধার্য তারিখে মৌখিক পরীক্ষা দিলো। মন মেজাজ বেশ ফুরফুরে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা কল্পনাতীত ভালো হয়েছে। পরের দিন নিয়োগকর্তার দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি বোর্ডে চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে। খোরশেদসহ ১৬ জনই নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে হাজির হলো। বেলা ১২টায় রেজাল্টশিট টানানো হলো। চারজন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত একজন অপেক্ষমাণ। খোরশেদ তার রোল নাম্বারটি না দেখে আশাহত হলো। অনির্বাচিতদের একজন বলে উঠল- ড্রাইভারের বাচ্চা কই? চল গাড়ির ধারে যাই, গাড়ির কাছে অবশ্যই আসবে। পাঁচজন প্রার্থী নিয়োগকর্তার গাড়ির ধারে গেল। খোরশেদ তাদের পিছু পিছু গিয়ে নিরাশ মনে ঘটনা কী জানার চেষ্টা করল। খানিকক্ষণ পর নিয়োগকর্তার গাড়ির চালক গাড়ির ধারে আসা মাত্রই পাঁচজনে ঘিরে ধরে একবাক্যে বলল, ‘তুই প্রতারক, আমাদের টাকা এখন ফেরত দে, নইলে...’। ড্রাইভার সাহেব তাদের শান্ত করে বলল, সাহেবের করার কিছু নেই, লোক নিবে চারজন, মন্ত্রী বেটা তালিকা পাঠাইছে পাঁচজনের। এদের নিয়োগ না দিলে সাহেবকে গাঁট্টি বাঁধতে বলেছে। একজন উত্তেজিত হয়ে বলল, তুইও তো পাঁচজনের কাছ থেকে টাকা নিছিস। টাকা এখন ফেরত দে, নইলে... বলেই পেছন থেকে একটি হকিস্টিক বের করল। হকিস্টিক দেখে খোরশেদের ভার্সিটির ক্যাম্পাসের মাইরের ব্যথা উতলে ওঠল। ন্যাড়া বেল তলায় একবার যায়। চাকরির দরকার নেই, মাইর থেকে বাঁচি, বলেই বাসস্ট্যান্ডের দিকে দৌড় দিলো। জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষায় অন্যরকম ভালো অ্যানসার করে চাকরি পাওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটিরও অপমৃত্যু হলো এবং হতাশার চাদরে মুড়িয়ে তার হৃদয় নামক গোরস্থানে কবরস্থ করল।
তৃতীয় স্বপ্নের হত্যা : স্নাতক পাস করার পর স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক পদের জন্য আবেদন করল। মোট প্রার্থী চারজন। অপর তিনজনের মেধা সম্পর্কে খোরশেদের বেশ জানাশোনা আছে। এই চাকরিটি তার নিশ্চিত হবে। যথারীতি লিখিত পরীক্ষা ও ভাইবা দিল। চাকরি হবে শতভাগ আশাবাদী। অপর তিনজনের একজন প্রিন্সিপাল সাহেবের ভাগিনা। প্রিন্সিপাল সাহেব আবার একটি মসজিদের পেশ ইমামও বটে। তিনি একাধারে প্রিন্সিপাল ও মসজিদের সম্মানীয় ইমাম হয়ে যদি তার ভাগিনাকে একটি চাকরি দিতে না পারেন, তাও আবার নিজের মাদ্রাসায়, তবে সমাজে তার ইজ্জত-আব্রু বলতে কি কিছু থাকে? অতএব নিয়োগ পরীক্ষা বোর্ডকে প্রভাবিত করে ভাগিনার চাকরির ব্যবস্থা করেন। খোরশেদের স্বপ্নটি গলা টিপে হত্যা করে, ইমাম সাহেব সমাজে বীরত্বের সাথে নিজ চেহারা মোবারক দেখানোর পথ সুগম করলেন। স্বপ্ন হত্যার প্রতিবাদস্বরূপ মাস্টার খোরশেদ প্রায় ২৩ বছর ধরে এই স্বপ্নহন্থারক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে না।
চতুর্থ স্বপ্নের অকাল বিসর্জন : কলেজ জীবনের শুরু থেকে এক মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়েটিও তাকে প্রাণাধিক পছন্দ করত। মেয়ের বাবার সাফ কথা কোনো বেকার ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিবে না। এদিকে খোরশেদ প্রাণপণ চেষ্টা করেও বেকার তকমা দূর করতে পারছে না। মেয়ে প্রেমের মর্যাদা রাখতে ক্যান্সার রোগীকে কেমোথেরাপি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো এখন বিয়ে করব না বলে দুইটি সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিয়েছে। এবার মেয়ের বাবা পরিবারের সদস্যেদের ডেকে বললেন- তিনি আর কারো কথা শুনবেন না। নতুন একটি সম্বন্ধ এসেছে, সেটি খুবই ভালো। ছেলে ওলাপাস। মাদ্রাসায় চাকরি করে। পৈত্রিক বিষয়-আশয় যথেষ্ট রয়েছ। ছেলেও দেখতে হ্যান্ডসাম, নুরানি চেহারা। এমন সম্বন্ধ তিনি হাতছাড়া করবেন না। কী আর করার কেমোথেরাপি দিয়েও আর রক্ষা হলো না। ফলে মাস্টার খোরশেদের হৃদয়মন্দিরে চতুর্থ স্বপ্নটিও সমাহিত হলো। মাস্টার খোরশেদের হৃদয়টি এরূপ বহু নিহত স্বপ্নের গোরস্থানে পরিণত হলেও তার কুঁড়েঘরের নাম দিয়েছে ‘শান্তিকুটির’। তাকে এমন নাম দেয়ার হেতু কী সওয়াল করা হলে, জবাব দেয়, ‘লাক্সারিয়াস বহুতল অনেক ভবনের মালিকরা কোথায় থাকে কেউ জানে না। দৃষ্টিনন্দন দালান বাড়িগুলো জনমানবহীন খাঁ খাঁ করছে। কেউ কেউকে বনে-বাঁদাড়ে কলাপাতার বিছানায়ও শুয়ে থাকতে দেখা যায় রাতবিরাতে। তার চেয়ে আমার কুটিরটি ঢের প্রশান্তির চাদরে মোড়ানো।’