ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

সভ্যতা নির্মাণে স্ত্রীর দেনমোহর

সাঈদ শরিফ
সভ্যতা নির্মাণে স্ত্রীর দেনমোহর

ইসলামি শরিয়তে দেনমোহর হলো বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত একটি আর্থিক দায়িত্ব। যা স্ত্রীকে স্বামী সম্মানসূচক হাদিয়া হিসেবে দিয়ে থাকে। এটা বিয়েতে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। দেনমোহর স্ত্রীর এমন এক অধিকার, যা আকদের সময় উল্লেখ না করলেও বাতিল হয় না। কারণ দেনমোহর শুধু একটি আর্থিক দায়ই নয়, বরং এটি স্ত্রীর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সম্মানের প্রতীক। অথচ অধিকাংশ নারী-পুরুষ এ ব্যাপারে উদাসীন। এই অধিকার নিয়ে নারীদের সজাগ হওয়া প্রয়োজন।

কোরআনে দেনমোহরের বিধান : ইসলাম পূর্ববর্তী জাহিলিয়াতের যুগে নারীদের হাতে দেনমোহরের অর্থ পৌঁছতো না। মেয়ের অভিভাবকগণ তা আত্মসাৎ করত। এটা ছিল নির্যাতনের আরেকটি রেওয়াজ। কোরআন এ প্রথা উচ্ছেদ করে দিয়ে স্ত্রীর মোহর স্ত্রীকেই দিতে বলেছে। দেনমোহরকে তার অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্ণিত হয়েছে, আর তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশি মনে। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর। (সুরা নিসা : ৪) সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াত ও সুরা মুমতাহিনার ১০ নং আয়াতে স্ত্রীকে মোহরানা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

উম্মুল মোমিনীনদের দেনমোহর : রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের দেনমোহর প্রদান করেছেন। তার দেয়া মোহর ইসলামি সভ্যতা সংস্কৃতিতে পরিমিত মান হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি এটা সরল জীবনযাপন ও সহজতার একটি প্রমাণও । আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রহ.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহধর্মিণী আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিবাহে মোহর কী পরিমাণ ছিল? তিনি বললেন, তার বিবিগণের মোহরের পরিমাণ ছিল বার উকিয়া ও এক না‘শ। তিনি বললেন, তুমি কি জান এক না’শ-এর পরিমাণ কতটুকু? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, এক না’শ-এর পরিমাণ হলো আধা উকিয়া। সুতরাং মোট পাঁচ শত দিরহাম। এই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহধর্মিণীগণের মোহর। (মুসলিম : ৩৩৫৮)

হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশি নিজ উদ্যোগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষে উম্মে হাবিবার সাথে বিবাহের আয়োজন করেন। অন্যান্য উম্মুল মুমিনিনদের চেয়ে তাকে বেশি দেনমোহর পরিশোধ করেন। বিবাহের ঘটনাটি নারী সাহাবিয়াদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রদানে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে। উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের স্ত্রী। তিনি হাবশাতে ইন্তেকাল করেন। এরপর (হাবশার বাদশাহ) নাজ্জাশি তাকে নবী করিম (সা.)-এর সাথে বিবাহ দেন এবং তার (নাজ্জাশি) নিজের পক্ষ হতে মোহরস্বরূপ চার হাজার দিরহাম আদায় করেন এবং তা সহ তাকে (উম্মে হাবিবাকে) শুরাহবিল ইবনে হাসানার সাথে প্রেরণ করেন। (আবু দাউদ : ২১০৩)

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ : কোরআন সরাসরি দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়নি। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দেয়া যৌক্তিক। তবে অধিক মোহরানা দেয়া জায়েয। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমরা যদি এক স্ত্রীর জায়গায় অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা স্থির কর এবং তাদের একজনকে অনেক অর্থও দিয়ে থাক, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিয়ো না।

তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচরণ দ্বারা তা গ্রহণ করবে? (সুরা নিসা : ২০) লোক দেখানো অনেক বড় অঙ্কের মোহর ধার্য করা যেমন শরীয়ায় কাম্য নয়, তেমনি তা একেবারে তুচ্ছ ও সামান্য হওয়াও উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের সাধারণ রীতি উত্তম আদর্শ। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কোন এক মহিলাকে শাদী করলেন এবং তাকে মোহরানা হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন রাসুল (সা.) তার মুখে শাদীর আনন্দের ছাপ দেখলেন, তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। প্রতিউত্তরে সে বলল, আমি একজন নারীকে খেজুরের আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে শাদী করেছি। (বোখারি : ৪৭৭৫)।

দেনমোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ : আজকাল বিয়েশাদীতে দেনমোহর নিয়ে সর্বত্র বাড়াবাড়ি হয়। জীবজন্তুর ক্রয়-বিক্রয়ের মতো আলাপ আলোচনা হয়। এটাকে ইস্যু বানিয়ে বিয়ের অনেক চূড়ান্ত আলোচনা ভেস্তে যায়। তাই এটা বরের ইচ্ছা ও সামর্থ্যরে উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। বেশি মোহর ধার্য করার মধ্যে গর্বের কিছু নেই। আবু আল-আজফা আস সুলামি (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমর (রা.) খুতবা প্রদানের সময় বলেন, তোমরা (স্ত্রীদের) মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না। যদি তা দুনিয়াতে সম্মানের বস্তু হত অথবা আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বস্তু হত, তবে তা পাওয়ার যোগ্যতম ব্যক্তি হতেন নবী কারিম (সা.)। তিনি তার স্ত্রীদের এবং তার কোন কন্যাদের জন্য বারো উকিয়ার অধিক পরিমাণ মোহর ধার্য করেননি। (আবু দাউদ : ২১০২)। মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ দশ দিরহাম অর্থাৎ প্রায় পৌনে তিন তোলা পরিমাণ রুপার সমপরিমাণ। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) নবী কারিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, যদি কেউ তার স্ত্রীর মোহর হিসাবে দু’অঙ্গুলি পূর্ণ (আজলা) আটা বা খেজুর প্রদান করে, তবে তা-ই তার জন্য যথেষ্ট। জাবির (রা.) অপর একটি হাদিসে বর্ণনা করেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে বিবাহের মোহর হিসাবে খাদ্যের সামান্য অংশ প্রদান করে তার নিকট হতে ফায়দা গ্রহণ করতাম। (আবু দাউদ : ২১০৬)

কোরআন শিক্ষার বিনিময়ে বিয়ে : ইসলাম বিবাহকে সহজ করার জন্য উৎসাহিত করে। অতিরিক্ত খরচ বা সামাজিক জটিলতায় আটকে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। সামান্য একটি আংটি, এমনকি ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েও বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। সাহল ইবনে সাদ আল সাইদী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে জনৈকা রমণী উপস্থিত হয়ে বলে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আমাকে আপনার নিকট বিবাহের (উদ্দেশ্যে) সমর্পণ করছি। এরপর সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তখন জনৈক (আনসার) ব্যক্তি দণ্ডায়মান হয় এবং বলে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাকে আমার সাথে বিবাহ দিন, যদি তাতে আপনার কোন প্রয়োজন না থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার নিকট এমন কিছু আছে কি, যদ্বারা তুমি তার মোহর আদায় করতে পার? সে বলে, আমার সাথে এই ইজার (পায়জামা) ব্যতীত দেয়ার মতো কিছুই নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন তোমার নিকট ইজার ছাড়া দেয়ার মতো আর কিছুই নেই, তখন অন্য কিছু দেয়ার জন্য অনুসন্ধান কর। সে বলে, আমি দেয়ার মতো কিছুই পাচ্ছি না। তিনি বলেন, যদি একটি লোহার আংটিও হয়, তবুও তা দেয়ার চেষ্টা কর। এরপর এর সন্ধান করে আমি ব্যর্থ হই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার নিকট কোরআনের কিছু আছে কি? সে বলে, হ্যাঁ, কোরআনের অমুক সুরাদ্বয় (আমার মুখস্থ আছে)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, তুমি কোরআনের যতটুকু মুখস্থ পার আমি তার বিনিময়ে তোমাকে তার সাথে বিবাহ দিলাম। (আবু দাউদ : ২১০৭)। হাদিস থেকে বোঝা যায় ইসলাম নারীদের নিজেদের পছন্দমতো পাত্র বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। অবশ্য সেটা শালীনতার মধ্যে হতে হবে। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোরআন শিক্ষা দেয়া দেনমোহর হতে পারে। কিন্তু ওলামায়ে কেরাম এ হাদিসের সঙ্গে অন্য হাদিসের সমন্বয় করে বলেন, স্ত্রীকে কোরআনসহ দ্বীনি শিক্ষা দেয়া স্বামীর দায়িত্ব। তবে মোহর হিসেবে স্ত্রীকে অবশ্যই মোহরে মিছিল দিতে হবে।

দেনমোহর কখন দিতে হয় : বিয়ের সাথে সাথেই মোহর আদায় করে দেয়া যায়। তবে সহবাসের পূর্বে প্রদান করাই উত্তম। তবে যদি স্ত্রী দেনমোহর প্রদান করা ছাড়াই সহবাসের অনুমতি প্রদান করে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বাকি স্ত্রী দেনমোহর প্রদান করা ছাড়া প্রথম সহবাসের পূর্বে বাঁধা প্রদান করতে পারবে। কিন্তু একবার সহবাস হয়ে গেলে আর বাঁধা দিতে পারবে না। কিন্তু স্বামীর জিম্মায় দেনমোহর আদায় না করলে তা ঋণ হিসেবে বাকি থেকে যাবে। স্ত্রী যদি উক্ত দেনমোহর মাফ না করে, আর স্বামীও তা পরিশোধ না করে, তাহলে কেয়ামতের ময়দানে স্বামী অপরাধী সাব্যস্ত হবে। তাই দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করে দেয়া জরুরি।

অর্ধেক মোহর পাবে কখন : বিয়ের সময় মোহর ধার্য হলে এবং বাসর ঘর অতিবাহিত হলে ধার্যকৃত পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। আর বাসর হওয়ার পূর্বে তালাক হলে ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক দেয়া ওয়াজিব হয়। তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার আগেই যদি তালাক দাও এবং তোমরা তাদের জন্য মোহর ধার্য করে থাক, তবে যে পরিমাণ মোহর ধার্য করেছিলে তার অর্ধেক (দেয়া ওয়াজিব), অবশ্য স্ত্রীগণ যদি ছাড় দেয় (এবং অর্ধেক মোহরও দাবি না করে) অথবা যার হাতে বিবাহের গ্রন্থি (স্বামী) সে যদি ছাড় দেয় (এবং পূর্ণ মোহর দিয়ে দেয়), তবে ভিন্ন কথা। যদি তোমরা ছাড় দাও, তবে সেটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। আর পরস্পর ঔদার্যপূর্ণ আচরণ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা-কিছুই কর, আল্লাহ তা নিশ্চিত দেখছেন। (সুরা বাকারা : ২৩৭)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত