খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের গোড়ার দিকে উমাইয়া শাসক প্রথম ওয়ালিদের শাসনামলে তারিক বিন যিয়াদ ও মুসা বিন নুসায়েরের নেতৃত্বে মুসলমানরা স্পেন জয় করে। এরপর সমগ্র স্পেন এবং এর আশপাশের আরো কিছু অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে আসে। পঞ্চদশ শতকের প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত এসব অঞ্চলে মুসলিম শাসন বিদ্যমান ছিল। মুসলিম শাসনাধীন এ অঞ্চল মুসলমানদের কাছে আন্দালুসিয়া নামে প্রসিদ্ধি অর্জন করে। ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে আন্দালুসিয়ার মুসলমানগণ অসামান্য অবদান রাখেন। প্রাক-মুসলিম যুগে শুধু আন্দালুসিয়া কেন সমগ্র ইউরোপ যে কতটা অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল তা ঐতিহাসিক ড্রপারের লেখায় ফুটে ওঠে ‘ইউরোপীয়রা তখনো বর্বর বুনো অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের শরীর অপরিষ্কার, মন কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। অধিবাসীরা ঝুপড়িতে বাস করত। মেঝেতে নল-খাগড়া বিছিয়ে দেয়ালে মাদুর টাঙিয়ে রাখতে পারলেই তা বিত্তবানের লক্ষণ বলে ধরা হতো। সীম, বরবটি গাছের মূল এমনকি গাছের ছাল খেয়ে ওরা মানবেতর জীবন-যাপন করত।’ ঐতিহাসিক স্টেনলী লেনপুল তো আরো কড়া কথা বলেন, ‘যখন আমাদের স্যাক্সসন পূর্ব-পুরুষরা কাঠের কুঠরীতে বাস করত, ময়লা খড়ের উপরে বিশ্রাম করত, যখন আমাদের ভাষা অসংবদ্ধ ছিল এবং পড়াশোনা শুধু কয়েকজন মঠবাসী পাদরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; তখন আমরা মুর সভ্যতার অসামান্য বিকাশ সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। তখন সব ইউরোপ বর্বর অজ্ঞতায় ও বুনো ব্যবহারে নিমজ্জিত ছিল।’ এমন একটি হীন অবস্থায় মুসলমানগণ ইউরোপে বিজ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হন। ছিনিয়ে আনেন সাফল্য। প্রতিষ্ঠা করেন মানবসভ্যতা। জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চায় তৎকালীন মুসলিমদের অবদান অসামান্য ও অনস্বীকার্য। এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো-
গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা : উমাইয়া আমির ও খলিফারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তারা প্রচুর অর্থ ব্যয়ে কর্ডোভাতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। সব খলিফাই দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। এক্ষেত্রে খলিফা দ্বিতীয় হাকাম ছিলেন সবার আগে। তিনি বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, কনস্টান্টিনপোল প্রভৃতি দেশ থেকে দুর্লভ গ্রন্থ সংগ্রহ করার জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী নিয়োগ করেন। তার গ্রন্থাগারে ৪ লাখ গ্রন্থ ছিল। ক্রমিক সংখ্যা ঠিক রাখার জন্য ৪৪টি তালিকা গ্রন্থ ছিল। এছাড়া আরো ৭০টি গ্রন্থাগার ছিল।
স্থাপত্যকলা : আন্দালুসিয়ার মুসলিম আমির ও খলিফারা স্থাপত্যকলায় তাদের অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গিয়েছেন। কর্ডোভার জামে মসজিদ আন্দালুসিয়ার মুসলিম স্থাপত্যকলার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়াও খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান তার প্রিয়তমা স্ত্রী জোহরাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘আজ-জোহরা’ নামে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাসাদ নির্মাণ করেন। প্রত্যেক আমির ও খলিফা মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, গোসলখানা নির্মাণ করে তাদের অবদান রাখেন। কর্ডোভার রাস্তায় যখন বাতি জ্বলত, তখন ইউরোপ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, ‘কর্ডোভার রাস্তায় যখন বাতি জ্বলত তার ৭০০ বছর পরেও লন্ডন অথবা প্যারিসের রাজপথে কোনো সরকারি বাতি দেখা যায়নি।’
চিকিৎসা : জনগণের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য উমাইয়া খলিফারা যথেষ্ট অবদান রাখেন। জনগণের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সর্বত্র চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়। রাজধানী কর্ডোভাতে ৫০টি হাসপাতাল ছিল। দেশের সব জায়গায় ওষুধের দোকান খোলা থাকত।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা : যখন মুসলিম আন্দালুসিয়া পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে অনেক উন্নত ছিল, তখন ইউরোপ কতটা নোংরা ছিল তা ঐতিহাসিক লেনপুলের বক্তব্যে ফুটে ওঠে, ‘আন্দালুসিয়া মুসলিম শাসনে যাওয়ার পূর্বে এক সন্ন্যাসী দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে স্নান অথবা দেহের কোনো অংশ ধৌত না করে কেবলমাত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠের সময় আঙুলের অগ্রভাগে পানি লাগিয়ে পবিত্রতা রক্ষা করে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সৃষ্টি করে।’ আর মুসলিম আন্দালুসিয়ায় তখন ৩০০টি হাম্মামখানা (গোসলখানা) ছিল। সর্বত্র সাবান তৈরির কারখানা ছিল। আর তখন ইউরোপের পাদ্রিরা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোসলকে পাপ কাজ বলে ঘোষণা করা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে মুসলিম আন্দালুসিয়া ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ।
ভাষা ও সাহিত্য : ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম মনীষীদের অবদান ছিল অপরিসীম। যেসব মুসলিম মনীষী ভাষা ও সাহিত্যে অবদান রাখেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আল কালি, আল যুবাইদি, ইবনে হায়সাম প্রমুখ। আল কালি ছিলেন কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যের অধ্যাপক। আরবি ভাষা ও সাহিত্য ইউরোপীয় মনীষীদের দারুণভাবে প্রভাবান্বিত করেছে। ইউরোপের বহু দেশ থেকে বহু মনীষী আন্দালুসিয়ায় আগমন করেন। সেখানে অধ্যয়ন করেন। আবার বহু গ্রন্থ আরবি থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে ইউরোপে জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেন। এসব মনীষীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পিটার এডিলাড, দ্বাদশ শতাব্দীতে আসেন ইংল্যান্ডের এডিলার্ড আর বার্থ, রবাট অব রিডিং, দানিয়েল মলি প্রমুখ। তারা মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে নতুন বলে বলীয়ান হয়। বহু ইংরেজি শব্দ আরবি শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়। যেমন- Good morning, Cotton, Algebra, Chemistry, Sandal. প্রভৃতি।
ইতিহাস চর্চা : ইতিহাস চর্চায় মুসলিম আন্দালুসিয়ার অবদান ছিল অপরিসীম। আন্দালুসিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ছিলেন ইবনে-আল-কুতিয়া। কর্ডোভানিবাসী আল-কুতিয়ার প্রখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘তারিখণ্ডইফবিত-আল-আন্দালুস। অন্যান্য বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের মধ্যে ছিলেন ইবনে খালাফ, আবদুল ওয়াহিদ প্রমুখ। জীবনী রচনাতেও মুসলিম আন্দালুসিয়ার ঐতিহাসিকগণ বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আল-ফারাবি, ইবনে বাস কুওয়াল ও ইবনে-আর-আবার।
দর্শনশাস্ত্র : দর্শনশাস্ত্রে আন্দালুসিয়ীয় মুসলমানদের অবদান ছিল অপরিসীম। গ্রিক দর্শন চিন্তাকে ইউরোপে আন্দালুসিয়ার মুসলিম দার্শনিকই পরিচিত করান। তারা ধর্ম ও বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা ও বিশ্বাসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে দর্শনশাস্ত্র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের মধ্যে ছিলেন আবু সীনা ইবনে মাসাবাহ, ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া, ঈসা বিন দিনার, আবু ইব্রাহিম, আবু বকর বিন মুয়াবিয়া, সাইদ বিন রাবিক, ইবনে তোফায়েল, ইবনে রুশদ, ইবনে বাজ্জা, ইবনে মায়মুন প্রমুখ। ইবনে রুশদ আন্দালুসিয়ার প্রাকৃতিক দার্শনিকদের সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন চিন্তার ওপর যে বিশাল ভাষ্য লেখেন তা ইউরোপের কাছে আজও বিস্ময়কর। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দালুসিয়ায় আগমন করে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করত। এমনকি ইবনে রুশদের দর্শনবিষয়ক গ্রন্থ প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবিষয় হিসেবে অনুমোদিত হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞান : আন্দালুসিয়ীয় মুসলমানরা চিকিৎসা ও শল্য বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। আন্দালুসিয়ার মুসলিম চিকিৎসাবিদরাই সর্বপ্রথম চিকিৎসা পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করেন। তারাই সর্বপ্রথম কেমিক্যাল, ফার্মেসি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন এবং চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ইবনুন হায়সাম, মুহাম্মদ ইবনে কাসুম, ইবনে জহুর, ইবনে রুশদ, আল-খাতির, সালা-উদণ্ডদীন-বিন-ইউসুফ প্রমুখ মনীষী চিকিৎসাশাস্ত্রে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেন।
শিল্প : বস্ত্র, চর্ম, লৌহ শিল্প এবং অলংকার তৈরিতে কর্ডোভা খুবই সমৃদ্ধ ছিল। উন্নতমানের মিহি সুতিবস্ত্র, রেশম সিল্ক ও লিনেন ইত্যাদি শিল্পে আন্দালুসিয়া খুব দক্ষ ছিল। এ শিল্পজাত দ্রব্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হত। শুধু এ কর্ডোভাতে ১০ হাজার বস্ত্রবয়ন শিল্পী ছিলেন। আন্দালুসিয়ার চামড়া শিল্প খুবই বিখ্যাত ছিল।
কৃষি : উমাইয়া খলিফারা কৃষির উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা খাল খনন ও সেচের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। রাজধানীতে পাইপের সাহায্যে পানি সরবরাহ করে শহরবাসীর পানির চাহিদা পূরণ করা হত।
ভূগোল চর্চা : বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আন্দালুসিয়ার মুসলমানরা যে উন্নতি সাধন করেছিল ইউরোপের কোথায়ও তা দেখা যায়নি। ভূগোলশাস্ত্র ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। ইবনে জুবায়ের, উবায়েদ আল-বাকরি, আল-ইদরীসির নাম ভূগোলবিদ হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল-বাকি ‘আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক’ গ্রন্থ রচনা করে অমর হয়ে আছেন। ইবনে জুবায়েরের অমর গ্রন্থের নাম ‘রিহালা’। আল-ইদরীসি ছিলেন মালাগারুদিবাসী। তিনি বিখ্যাত কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি সমগ্র ইউরোপ ও এশিয়া ভ্রমণ করেন।
জ্যোতির্বিদ্যা : জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রেও আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের অবদান ছিল অপরিসীম। গ্রহ, নক্ষত্রের গতি নির্ধারণ, তাদের পরস্পরের নির্ভরতা নিয়ে গবেষণা এবং পৃথিবীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিরূপণে মুসলমানদের কৃতিত্ব ছিল অপরিসীম। মুসলমান জ্যোতির্বিদগণ বছরের দৈর্ঘ্য, নক্ষত্রের গতি, সূর্যের কক্ষের কেন্দ্রস্থতি, কক্ষের গতি ইত্যাদি বিষয়ে অনেক গবেষণা করেন। আন্দালুসিয়ার স্বনামধন্য জ্যোতির্বিদদের মধ্যে ছিলেন- আল-মাজারতি, আল জারকিলি, ইবনে আফলা, আল বিতরুজি, আল খাবির, আহমদ বিন নসর, ইবনুল কাশিম প্রমুখ।
জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে : জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষীদের অবদান ছিল অপরিসীম। মুদ্রণযন্ত্রের অভাবে মূল্যবান পাণ্ডুলিপি তৈরির জন্য পৃথক সংস্থা ছিল এবং হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি সংখ্যা দেখে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও শিক্ষা-দীক্ষার সম্প্রচার সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে ‘ষোড়শ শতাব্দীতে দ্বিতীয় ফিলিপস (১৫৫৬-৯৮ খ্রি.) ধ্বংসপ্রাপ্ত মুসলিম গ্রন্থাগার থেকে ২০০০ গ্রন্থ সংগ্রহ করেন যা পরবর্তীকালে ঊীপঁৎরধষ গ্রন্থাগারের ভিত্তি রচনা করে এবং ইউরোপে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নব উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।’
উদ্ভিদ বিজ্ঞান : উদ্ভিদবিদ্যায় আন্দালুসিয়ীয় মুসলমানরা বেশ সাফল্য অর্জন করেন। তারা গ্রিক উদ্ভিদবিদদের সংগৃহীত গাছপালার নামের সঙ্গে আরো ২ হাজার নতুন গাছপালার নাম সংযোজন করেন। কর্ডোভা ও অন্যান্য শহরে উদ্ভিদবিদ্যা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বোটানিক্যাল গার্ডেন’ ছিল। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা শিক্ষা দেয়া হত। উদ্ভিদবিদ্যা আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের অগাধ জ্ঞান কৃষি কাজের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মুসলিম আন্দালুসিয়ার উদ্ভিদ বিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন দেশ থেকে দুর্লভ বৃক্ষাদি, বীজ, লতাপাতা সংগ্রহ করে তার ওপর গবেষণা করতেন। তারা বৃক্ষের শ্রেণিকরণ, বিশ্লেষণ ও গুণাগুণ বিচার করতেন।
রসায়নশাস্ত্র : রসায়নশাস্ত্রেও আন্দালুসিয়ীয় মুসলমানদের অবদান ছিল অপরিসীম। দশম শতাব্দী থেকে আন্দালুসিয়ায় রসায়ন চর্চা হতে থাকে। কর্ডোভা, মালাগা, সেভিল, গ্রানাডা ও টলেডোর শাসকগণ রসায়নশাস্ত্রের উৎকর্ষতার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আন্দালুসিয়ার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নশাস্ত্র একটি অন্যতম পাঠ্যবিষয় ছিল। যাবের-বিন-হাইয়ান ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ। তাকে ‘আধুনিক রসায়নশাস্ত্রের জনক’ বলা হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম আন্দালুসিয়ার অবদান ছিল অপরিসীম। ইউরোপে যে সময় গোসলকে পাপ বলা হতো, সে সময় মুসলিম আন্দালুসিয়ায় ৩শ গোসলখানা ছিল। আবার যখন আন্দালুসিয়ায় রাতে বাতি জ্বলত তার ৭০০ বছর পরেও লন্ডনের রাস্তায় বাতি দেখা যায়নি। এ আন্দালুসিয়ার মাধ্যমেই ইউরোপে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সেখানে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সূচনা করতে সাহায্য করে। ঐতিহাসিক টমাস আরনল্ড বলেন, ‘রেনেসাঁ যুগের পূর্ব পর্যন্ত খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের মানসিক বিকাশের জন্য আন্দালুসিয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম আন্দালুসিয়াই ছিল সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মশালবাহী সৈনিক।’ প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জোসেফ হেল যথার্থই বলেছেন, ‘খ্রিষ্টান প্রতীচ্য মুসলিম বিজ্ঞানকে শুধু গ্রহণই করেনি বরং এর প্রসারতা ও উৎকর্ষতায় অবদান রেখেছে।’
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা