বসতবাড়ি মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী স্বপ্নের বসতবাড়ি নির্মাণ করে। এটা মূলত আল্লাহর দেয়া একটি নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে করেছেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল। (সুরা নাহল : ৮০)। মোমিনের ঘরবাড়ি আল্লাহর রহমতের কেন্দ্রবিন্দু। মোমিন বান্দার বাড়ি সাধারণত কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, নামাজের পরিবেশ, আখলাকের শোভা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আলোকিত হয়। প্রকৃত মোমিনের বাড়ি এমন হওয়া উচিত, যা দেখে অন্যরা অনুপ্রাণিত হয়। আমলে আগ্রহ বাড়ে ও কল্যাণকর সভ্যতা নির্মাণে উদ্যমী হয়।
নামাজের পরিবেশ থাকা : একজন মোমিনের দায়িত্ব হলো নিজে নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, আর আপনার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন ও তাতে অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিজিক চাই না, আমিই আপনাকে রিজিক দিই। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়াতে নিহিত। (সুরা ত্বহা : ১৩২)। বাড়িতে নারীদের নামাজের জন্য আলাদা ঘর বা স্থান নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। যেন মুসাফির কোনো নারী এসেও নামাজ আদায়ের সুযোগ পায়।
কোরআন চর্চা : একজন মোমিনের বাড়ি আলোকিত রাখার অন্যতম প্রধান উপায় হলো দৈনিক কোরআনের চর্চা অব্যাহত রাখা। সকাল-সন্ধ্যা তিলাওয়াত করা এবং কোরআনের অর্থ ও মর্মার্থ উপলব্ধি করার অভ্যাস গড়ে তোলা। কোরআনের চর্চা হৃদয়কে প্রশান্ত করে, শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে। আল্লাহর পরিবারভুক্ত হওয়া যায়। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহর পরিবারভুক্ত। সাহাবীগণ আরজ করল, হে আল্লাহর রাসুল! তারা কারা? তিনি বলেন, যারা আল-কোরআন পাঠকারী এবং এর উপর আমলকারী; এরা হলেন আল্লাহর পরিবার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। (ইবনে মাজা : ২১৫)।
ঘরে ফেরেশতাদের আগমন : কোরআন তিলাওয়াতের বদৌলতে ঘরের পুরো পরিবেশে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও আলোকিত অবস্থা সৃষ্টি হয়। ফেরেশতারা এমন পরিবেশে আগ্রহ নিয়ে অবতরণ করেন। তখন তিলাওয়াতকারীর প্রতি রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, উসায়দ ইবনে হুজায়র (রা.) যখন তার আস্তাবলে তিলাওয়াত করছিলেন, তখন হঠাৎ তার ঘোড়াটি অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগল। তিনি আবার তিলাওয়াত করলে ঘোড়া আবার অস্থির হয়ে উঠল। তিনি পুনরায় তিলাওয়াত করলে ঘোড়াটি আবারও অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগল। উসায়দ (রা.) বলেন, আমার এখন আশঙ্কা হলো, ঘোড়া (ওখানে কাছেই শুয়ে থাকা আমার পুত্র) ইয়াহয়াকে মাড়িয়ে দিতে পারে তাই আমি উঠে তার (ঘোড়ার) কাছে গেলাম। তখন দেখলাম যে, আমার মাথার উপরে একটি প্রদীপের মতো কিছু, যার মাঝে প্রদীপের মতো কিছু শূন্যে লটকে রয়েছে। পরে আমি তা আর দেখলাম না। উসায়দ (রা.) বলেন, সকালে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে গিয়ে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! গত মাঝরাতে যখন আমি আমার আস্তাবলে তিলাওয়াত করছিলাম, হঠাৎ আমার ঘোড়া অস্থির হয়ে উঠল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইবনে হুজায়র! পাঠ করতে থাকতে, তিনি বললেন, আমি পাঠ করতে থাকলাম, সে আবার অস্থির হয়ে উঠল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইবনে হুজায়র! পাঠ করতে থাকতে, তিনি বলেন, আমি আবার পাঠ করতে থাকলাম, ঘোড়াটি আবারো অস্থির হয়ে উঠল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইবনে হুজায়র! তুমি পাঠ করতে থাকতে! ইবনে হুজায়র (রা.) বলেন, তখন আমি পাঠ সমাপন করলাম। (আমার ছেলে) ইয়াহয়া ছিল ঘোড়াটির কাছে। তাই আমার আশঙ্কা হলো, সে তাকে মাড়িয়ে দিতে পারে। আমি তখন দেখলাম একটি মেঘপুঞ্জের মতো যার নিচে যেন অনেক প্রদীপ ঝুলে রয়েছে। পরে আর তা দেখতে পেলাম না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, এরা ছিলেন ফিরিশতা। তারা তোমার তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তুমি যদি তিলাওয়াত করতে থাকতে তবে তারা সকাল পর্যন্ত থেমে যেত এবং লোকেরা তা দেখতে পেত, তারা তাদের কাছে হতে আত্মগোপন করত না। (মুসলিম : ১৭৩২)।
লজ্জাশীলতার চাদর : একজন মোমিনের বসতবাড়িতে পর্দা ও লজ্জাশীলতার চাদর থাকা বাঞ্ছনীয়। নারী সদস্যবৃন্দ ঢিলে ঢালা পোশাক পরে চলাচল করা উচিত। পর্দার ভেতরে থেকে প্রয়োজন মত খেদমতের হাত বাড়িয়ে দেয়। ছোট-বড় প্রত্যেকটি সদস্যের মধ্যে শালীনতা বজায় থাকে। আমর ইবনে শুআয়েব (রহ.) পর্যায়ক্রমে তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের সন্তানরা সাত বছরে উপনীত হবে, তখন তাদের নামাজ পড়ার নির্দেশ দেবে এবং তাদের বয়স যখন দশ বছর হবে, তখন নামাজ না পড়লে এজন্য তাদের মৃদু আঘাত কর এবং তাদের (ছেলেমেয়েদের) বিছানা পৃথক করে দেবে। (আবু দাউদ : ৪৯৫)।
শৈশব-কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে যাবার আগেই শিশুরা মোটামুটি বোঝদার হয়ে যায়। ছেলেমেয়ের মধ্যকার পার্থক্যগুলো তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই তাদের বিছানা আলাদা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক বিছানায় ঘুমালে একে অন্যের সতর দেখে ফেলতে পারে। এটা লজ্জা-শরম নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথ খুলে দেয়। লজ্জা-শরম মানুষের আখলাক-চরিত্রের আবরণস্বরূপ। এটা নষ্ট হয়ে গেলে সবরকম বদআখলাকের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে। এই কারণে ফকিহগণ সন্তানের বয়স ১০ বছর হলে শোয়ার বিছানা পৃথক করে দেয়াকে ওয়াজিব বলেছেন। এ বয়সে ছেলের জন্য মায়ের সাথে এবং মেয়ের জন্য বাবার সাথে একই বিছানায় শোয়াও নিষেধ।
ঘরে দৈনন্দিন তালিম করা : একজন মোমিনের ঘরবাড়িতে তালিমের রুটিন থাকে। আর থাকে সাজানো গোছানো লাইব্রেরি। ছোট্ট লাইব্রেরিতে কোরআন, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ ও ঈমানদীপ্ত গল্পগুচ্ছের বইয়ের সমাহার থাকে। যে বইগুলো অবসর সময়ে ছোট বড় সবাই পড়তে পারে। কাজের পাশাপাশি একজন দায়িত্ববান মোমিন ঘরের তালিমের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে। একবার মহিলারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অনুরোধ করল যে, পুরুষরা আমাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করছে অর্থাৎ দ্বীনি শিক্ষা অর্জনে তারা এগিয়ে আছে। (ইলমের মজলিসে তারাই সর্বদা থাকে) তাই একদিন আমাদের জন্য নির্ধারণ করুন। (যেদিন আমাদের দ্বীন শিক্ষা দিবেন) তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের নসিহত করার জন্য বিশেষ দিন নির্ধারণ করেন। (বোখারি : ১০১)।
মেহমানদারি করা : একজন মোমিনের স্বপ্নের কুঠিরে কেউ মেহমান হয়ে এলে সাধ্যমত খেদমত করেন। কাউকে খালি মুখে ফেরত দেন না। কেননা, মহানবীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাত মেহমানদারি করা। তিনি মেহমানদারি করা পছন্দ করতেন। সাহাবিদের মেহমানদারি করতে বলতেন। মেহমানের গুরুত্ব ও ফজিলত বোঝাতেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে নতুবা চুপ করে থাকে। (বোখারি : ৫৫৯৩)।
প্রাণীর ছবি না থাকা : একজন মোমিন তার প্রিয় পরিবারকে ছবিমুক্ত ঘরবাড়ি উপহার দেয়। ঘরের দেয়ালে অন্যদের মতো ছোট সন্তানের ছবি বা-মৃত মানুষ এবং জীবজন্তুর ছবি টানিয়ে বা সাঁটিয়ে রাখে না। আলমারি, শোকেস ও কর্নার শেলফ থেকেও খেলনা মূর্তি সরিয়ে রাখে। এগুলো রহমত আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। আবু তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, যে ঘরে কুকুর থাকে আর প্রাণীর ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করেন না। (বোখারি : ২৯৯৮)।
গান বাদ্য পরিহার করা : ইসলাম গান-বাজনাকে হারাম ঘোষণা করেছে। অশ্লীল গান-বাজনা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। একজন প্রকৃত মোমিন স্বীয় পরিবার-পরিজনকে গান বাদ্য থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখেন। কারণ গান বাদ্যের প্রভাব মানুষের দিল পাথর করে দেয়। এখন অধিকাংশ মোনাজাতে আর আগের মতো চোখে পানির ঢেউ আসে না। রাসুল (সা.) সর্বদা বাদ্যযন্ত্র থেকে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। নাফি (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা ইবনে উমর (রা.) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে তার কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেন। তিনি সেখান থেকে দূরে গিয়ে আমাকে বলেন, হে নাফি! তুমি কি এখনও কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছ? আমি বলি, না। তখন তিনি তার কান থেকে আঙুল বের করে বলেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম, তিনি এরূপ শব্দ শুনে-এরূপ করেন। (আবু দাউদ : ৪৮৪৪)।
বৃক্ষ রোপণ : বসতবাড়ি সুন্দর ও পরিপাটি করা ইসলামে নিষেধ নয়। তবে বসতবাড়ি নিয়ে অহংকার ও চাকচিক্যের পেছনে পড়ে থাকা নির্বুদ্ধিতা। বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন ফল ও ঔষধি গাছ লাগানো মোমিনের বাড়ির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করা যায়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, যে কোন মুসলমান ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তা তার পক্ষ থেকে সদকা বলে গণ্য হবে। (বোখারি : ২১৬৯)।
লেখক : শিক্ষক ও খতিব