ঢাকা শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

রমজানের পূর্ব-প্রস্তুতি

ইলিয়াস মশহুদ
রমজানের পূর্ব-প্রস্তুতি

পবিত্র রমজান মাস প্রত্যাসন্ন। রমজান আসার আগ থেকেই মোমিন বান্দারা রমজান পালনের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকেন। রমজান সিয়াম সাধনার মাস। এ মাস ব্যাপকহারে পাপ থেকে বেঁচে থাকার সাধনা করার মাস। আত্মা ও মানবতা বিকাশ ও উন্নয়ন করার মাস। মোটা দাগে কিছু কাজ বর্জন করা আর কিছু কাজ বাস্তবায়ন করাই এ মাসের সাধনার বিষয়। এ সাধনার মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠে একটি কল্যাণকর সমাজ ও জীবনব্যবস্থা। এ মাসের সাধনাকে ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আমরা একাজগুলো করতে পারি।

ইবাদতে প্রতিবন্ধকতামূলক কাজ এড়িয়ে চলা : যেসব কাজ রমজানে ইবাদত-বন্দেগিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা। শেষ করা সম্ভব না হলে রমজানের পরে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। পুরো রমজানকে ইবাদতে কাটানোর জন্য নিজেকে সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে আপেক্ষিকভাবে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

রমজানের ব্যাপারে পরিবারকে সচেতন করা : স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে বসে রমজানের মাসয়ালা-মাসায়েল আলোচনা করা এবং ছোটদেরও রোজা পালনে উদ্বুদ্ধ করা। পাশাপাশি যেসব বই ঘরে পড়া যায়, এমন কিছু বই সংগ্রহ করা অথবা মসজিদের ইমামকে হাদিয়া দেয়া, যেন তিনি মানুষকে পড়ে শুনাতে পারেন।

নফল রোজা রাখা : রমজানের রোজার প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসে কিছু রোজা রাখা। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত; ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনভাবে সিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে সিয়াম ভঙ্গ করতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের গোটা অংশ রোজা পালন করতে দেখিনি এবং শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে বেশি সিয়াম পালন করতে দেখিনি।’ (বোখারি : ১৮৬৮)।

কোরআন তিলাওয়াত করা : হজরত সালামা ইবনু কুহাইল বলেছেন, ‘শাবান মাসকে তেলাওয়াতকারীদের মাস বলা হত।’ শাবান মাস শুরু হলে আমর ইবনু কায়েস তাঁর দোকান বন্ধ রাখতেন এবং কোরআন তিলাওয়াতের জন্য অবসর নিতেন।’

মিথ্যা ও পরনিন্দা বর্জন করা : মিথ্যা বলা মহাপাপ। মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মিথ্যাচারীরা ধ্বংস হোক।’ (সুরা জারিয়াত : ১০) তাই রোজা রেখে মিথ্যা বলা আরো জঘন্য কাজ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যদি কেউ রোজার সময় মিথ্যা বলে তবে তার রোজা রোজা নয়।’ (সুনানে তিরমিজি : ৭০৭)।

আর অন্যের নিন্দা করা আমাদের অনেকেরই স্বভাবজাত একটি বদঅভ্যাস। এটি অত্যন্ত ভয়ানক গুনাহের কাজ। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গিবতকারী।’ (সুরা হুমাজা : ১)। কিন্তু কেউ যদি রোজা রেখে তা করে সেটি আরও মারাত্মক। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যদি কোনও রোজাদার ব্যক্তি কোনও মুসলমানের নিন্দা করে তবে মনে হয় যে সে আল্লাহর হালাল করা খাদ্য খেয়ে রোজা রেখেছিল এবং আল্লাহর নিষেধ করা কিছু দিয়ে রোজা ভেঙে ফেললো।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৩৬৫৩)।

অশালীন কথাবার্তা না বলা : হাদিসে কুদসিতে এসছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, তখন সে যেন অশালীন কথাবার্তা না বলে ও হই চই না করে।’ (বোখারি : ১৯০৪)। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা নয়। রোজা হলো অনর্থক ও অশ্লীল কথা-কাজ বর্জন করার নাম। কেউ তোমাকে গালি দিলে বা তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তুমি তার সঙ্গে তেমনটি না করে কেবল এটুকুই বলো, ‘আমি রোজাদার।’ (মুসলিম : ২৪১৬)। উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো যে শুধু রমজানেই বিরত থাকতে হবে, এমনটি নয়; সবসময় এগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ইসলামও এটাই নির্দেশ দেয়। তবে রোজা রেখে এগুলোতে লিপ্ত হলে আমাদের সারা দিন না খেয়ে থাকা অনেকটা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তখন আমাদের রোজা রেওয়াজে পরিণত হয়। এ জন্য এখন থেকেই এসব মন্দ বিষয়গুলো থেকে আমরা নিজেদের বিরত রাখার প্রস্তুতি শুরু করব, যাতে রমজানে আমাদের রোজা রাখা সার্থক হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত