নওগাঁয় এ বছর আলু উৎপাদনের পরিমাণ বেশি হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম তুলনামুলক কম হওয়ায় দুশ্চিন্তা বেড়েছে কৃষকদের। আবার হিমাগারে সংরক্ষণেও স্বল্পতা রয়েছে।
হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে চাষিদের। কৃষকদের অভিযোগ- ব্যবসায়িদের আলু হিমাগারে দ্রুত নেয়া হলেও কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আবার অনেকে জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। গত বছর আলুর ভালো দাম পেয়েছিল কৃষক। আর ভালো দাম পাওয়ার আশায় এ বছর আলু চাষিরা আশায় বুক বেধে চাষাবাদ করেছে। যেখানে উন্নত জাতের আলু ডায়মন্ড, স্টিক ও কাটিনাল চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু আলু উত্তোলনের পর দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে। একদিকে বেড়েছে উৎপাদন খরচ আবার অপরদিকে সংরক্ষণ করা নিয়ে বিড়ম্বনা। এতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ- গত বছর ৬৫ কেজি আলুর বস্তায় ৩৫০ টাকা হলেও এবছর ৬০ কেজির বস্তা হিমাগারে রাখতে খরচ পড়ছে ৪০০-৪২৫ টাকা। যা গত বছরের তুলনায় ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি। ব্যবসায়িদের আলু হিমাগারে দ্রুত নেয়া হলেও কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আবার অনেকে টোকেন/রশিদ কাটার পরও জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। আবার অনেকে টোকেন সংগ্রহ করতে পারেননি।
কৃষকদের সুবিধবার জন্য হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানো দাবি জানানো হয়। কৃষকরা বলছেন- এবছর আলু বীজ, শ্রমিক, কীটনাশক ও আনুষঙ্গিক মিলে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে অন্তত ৩৫-৩৬ হাজার টাকা। যা গত বছরের তুলনায় ৫-৬ হাজার টাকা বেশি। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারে প্রকারভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকা কেজি। এ বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি পড়েছে। ন্যায্য দাম না পেলে লোকসান গুনার পাশাপাশি আগামীতে আলু চাষের আগ্রহ হারিয়ে যাবে। বদলগাছী উপজেলার ভবগানপুর গ্রামের কৃষক জামিল হোসেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন- ৪ বিঘা জমিতে ডায়মন্ড জাতের আলুর আবাদ করেছি। যেখানে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। প্রতি বিঘায় ৭০-৮০ মণ ফলন হয়েছে। হিমাগারে সংরক্ষণের ঝামেলা এড়াতে জমি থেকেই ৬০০ টাকা মন দরে আলু বিক্রি করে দিয়েছে। তবে কিছুদিন সংরক্ষণ করা গেলে ভালো দাম পাওয়া যেতো। এ বছর আলু উৎপাদনে খরচি বেশি হয়েছে। যদি ৩০ টাকা কেজির নিচে আলু বিক্রি করা হয় তাহলে লোকসান গুনতে হবে। এ বছর প্রচুর পরিমাণে আলু চাষ করা হয়েছে।
কিন্তু সবার পক্ষে হিমাগারে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বদলগাছী উপজেলা হিমাগারের হামিদুল হক নামে এক এজেন্ট বলেন- এ বছর হিমাগারে ১ হাজার বস্তা আলু রাখার বরাদ্দ পেয়েছি। প্রতি বস্তায় ২০ টাকা লাভ থাকবে।
তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচসহ আনুঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের সমস্যা হচ্ছে। সদর উপজেলার শিকারপুর গ্রামের কৃষক নাছের প্রামাণিক বলেন- ইষ্টার্ণ প্রডিউস কোল্ড স্টোরেজ বীজ আলু রাখার জন্য আগেই টোকেন (রশিদ) কেটে রেখেছিলাম। সে অনুযায়ী আলু হিমাগারে নিয়ে আসা হয়। প্রচুর চাপ থাকায় দুইদিন ঘুরতে হয়েছে।
শেষ সময়ে হিমাগার থেকে বলা হয় আলু রাখা যাবে না জায়গা পুরন হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে ফেরত নিয়ে যেতে হয়। অথচ ব্যবসায়িদের আলু হিমাগারে রাখা হয়েছে। বীজ আলু যদি সংরক্ষণ করে রাখতে না পারি আগামীতে কিভাবে আবাদ করবো।
নওগাঁ ইষ্টার্ণ প্রডিউস কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড এর হিসাবরক্ষক শিতাংসু কুমার মৈত্র বলেন- হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৭৫ হাজার (৫০ কেজির বস্তা) বস্তা। নির্ধারিত সময়ের আগেই হিমাগারে আলু ধারণক্ষমতা পুরণ হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে না। এ কারণে অনেক কৃষক আলু রাখতে না পেরে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু এজেন্ট আছে যারা অতিরিক্ত টোকেন (রশিদ) বিক্রি করেছে। মুলত তাদেরকেই ফেরত যেতে হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবছর বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ সহ আনুঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় সমিতি থেকে হিমাগার সংরক্ষণ খরচ বাড়ানো হয়েছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচাল মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন-জেলায় এ বছর ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৫ লাখ টন উৎপাদনের আশা। জেলায় হিমাগার রয়েছে ৭টি। যার ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার ৫৩০ টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃদ্ধ আলু পাশের জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
তবে কৃষকরা যদি বাড়িতে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কয়েক মাস আলু সংরক্ষণ করতে পারে তাহলে ভালো দাম পেয়ে লাভবান হতে পারবে এবং সে বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া হিমাগারে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে সে বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। আলু রপ্তানি করা গেলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশাবাদী।