২০০ বছরের অধিক পুরোনো বাংলার একটি সমৃদ্ধ জনপদ, জমিদারী শাসন ব্যবস্থার একটি অনন্য নিদর্শন, বৃটিশ আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার আবাইপুর রামসুন্দর শিকদার জমিদার বাড়ির আঙিনা।
জমিদার রামসুন্দর শিকদার ১২০০ বঙ্গাব্দের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তরে আবাইপুর গ্রামে একটি জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। এই জমিদার বংশের আগের বংশগত উপাধি ছিল তিলিকুণ্ড। পরবর্তীতে জমিদার রামসুন্দর শিকদারের ঠাকুর দাদা কার্তিক শিকদার মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছ থেকে এই শিকদার উপাধি লাভ করেন। তখন থেকেই তারা তিলিকুণ্ড সম্প্রদায় থেকে শিকদার সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত হন। মি. রামসুন্দর শিকদার এখানে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, থিয়েটার হল এবং একটি বড় বাজার স্থাপন করেন।
কুমার নদের পাশে বাজার এবং ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে ওঠায় তার জমিদারী এখানে আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠে। তার ০৭ জন পুত্র ছিলেন। ২৫ বৈশাখ ১২৭০ বঙ্গাব্দে তার মৃত্যুর পর সন্তানেরা সবাই মিলে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে তার জমিদারী ও ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তারা ৭ ভাই মিলে শিকদার অ্যান্ড কোম্পানি নামে পাট ব্যবসা করে সফলতা অর্জন করেন, তখন সময় বাংলা ১৩০৪ সন। এভাবে বাংলা ১৩১৯ সনে তাদের কোম্পানির পাট বিশ্বের মধ্যে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা লাভ করে। যার ফল সরূপ তখনকার ভারত বর্ষের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন তাদের কোম্পানিকে প্রিন্স অব জুট বেলার্স উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের বংশের লোকদের মধ্যে এই জমিদারী সম্পদের সব সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায় এবং তারা অধিকাংশ ভারত কলকাতাসহ বিদেশে বসবাসের জন্য পাড়ি জমান। আবার অনেকে বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। এইভাবেই তাদের দীর্ঘদিনের জমিদারী শেষ হয়ে যায়। জমিদার রামসুন্দর এর পুত্ররা তার মৃত্যুর ২৫ বছর পর তার নামে আবাইপুর গ্রামে রামসুন্দর ইনস্টিটিউট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রচলিত আছে, এখানে প্রায় চারশত বিঘা জমির উপর দ্বিতল বিশিষ্ট্য এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন রাম সুন্দর শিকদার। জমিদার বাড়ির প্রাসাদ এখন আর আগের মত নেই। অনেকাংশই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
প্রাসাদের এক অংশে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস রয়েছে। আরেকাংশে জমিদার বাড়ির উত্তরসূরি বা বংশধররা এখনো বসবাস করছেন। আবাইপুর রামসুন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরেকটি নিদর্শন, যা আবাইপুর বাজার সংলগ্ন রাস্তার ধারে অবস্থিত। পাশেই রয়েছে আবাইপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও যমুনা শিকদার কলেজ। বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী তাদের কাছে এখনো জমিদার বাড়ির ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র গচ্ছিত রয়েছে। যেগুলো হলো একটি সচল বৃহত গ্রামফোন (কলের গান), পাথরের তৈরি হুক্কা, একটি তরবারি, প্রাচীন আমলের বাদ্যযন্ত্র, সাল কাঠের তৈরি পুরাতন দুটি মন্দির ও রূপার তৈরি জরির নকশা করা বেনারসি শাড়ির অংশবিশেষসহ বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এগুলো এখন মূলত রামসুন্দরের উত্তরসুরি রাজকুমার শিকদারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এ বিষয়ে শৈলকুপার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম সিরাজুস সালেহীন জানান, জমিদার রামসুন্দর শিকদারের পরিত্যক্ত ভবনে আবাইপুর ইউনিয়ন সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের কার্যক্রম চলমান। ঐতিহাসিক এই ভবনটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।