ঢাকা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৭ আশ্বিন ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উন্নয়ন হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ

মোঃ মাঈন উদ্দীন
প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উন্নয়ন হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ

একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা উন্নতি করেছে, তার প্রধান নিয়ামক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আর উন্নয়ন হল কোনো ব্যক্তি বা সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক অগ্রগতির একটি জটিল প্রক্রিয়া। বাস্তবিক অর্থে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে একটি নীতিগত হস্তক্ষেপ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি দিক। সম্প্রতি উন্নয়ন শব্দটির সাথে টেকসই শব্দটি যুক্ত হয়েছে, যার অর্থ হলো বৈষম্যহীন ও খুতবিহীন উন্নয়ন। সমাজ ও পরিবেশ ব্যবস্থায় সর্ব নিম্ন ক্ষতি স্বীকার করে যে উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশ সুরক্ষা ও নারীর অংশগ্রহণ ও অপরিহার্য। সুশাসন ও জবাবদিহিতা টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার নীতি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। এর অন্যতম সূচক হলো আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। জবাব দিহিতার ঘাটতির কারণে দেশের আর্থিক খাত থেকে শুরু করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাজে ক্রটি দেখা যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়নের পথ মসৃন হয় না। মাথাপিছু আয় যদি দ্বিগুণ ও হয় আর দারিদ্র্য, বেকারত্ব, আয় অসমতা যদি সামাজিকভাবে বেড়ে যায় তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলা যাবে না। আধুনিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল টোডারের মতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। হলো একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সামাজিক কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূর হয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটবে মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন আসবে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করে ৫২ বছর অতিক্রম করছে। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বিশাল জনসংখ্যার দেশ একটি সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পেরেছি। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ও সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করতে এখনো সক্ষম হয়নি। বিগত ৫০ বছরে আমরা যতটুকু প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি তার চেয়ে সামাজিক বৈষম্য বেশি তৈরি হয়েছে। শুধু আয় বা সম্পদে নয় ভোগ ও সামাজিক সুযোগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রতিফলিত হচ্ছে। এই বৈষম্য আমাদের জাতিকে বিশেষ করে যুব সমাজকে মূলধারা থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে যেসব সেবা, বিনিয়োগ ও সুবিধা বণ্টন করা হয়েছে, তা সবার কাছে পৌঁছেনি। জাতীয় উন্নয়নের সুবিধা গরিব ও দরিদ্র সম্প্রদায় কম পাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি বিকাশমান। ও সম্প্রসারণশীল কিন্তু তা অন্যয্য ও বৈষম্যমূলক। প্রবৃদ্ধির সুফল মধ্যবৃত্ত, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে আপেক্ষিকভাবে কম পৌঁছাচ্ছে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলাহীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই খাতে খেলাপি ঋণ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে নানা অনিয়ম, মুদ্রা পাচার ও দুর্নীতি। ব্যাংকে রয়েছে সুশাসনের অভাব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নজরদারির ঘাটতি। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। রেমিট্যান্স মোটামুটি ভালো গতিতে আগালেও আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতা ও দিকনির্দেশনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত হারে রেমিট্যান্স আসছে না। মূল্যস্ফীতি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে (২০২৩) আগস্ট সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশের ও বেশি। পাশাপাশি সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির বিপরীতে গড় মজুরির হার বাড়েনি। গত ১ বছরের মজুরির গড় হার সাড়ে ৭ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২০২৪) প্রথম তিন মাসে মূল্যস্ফীতি, প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, খেলাপি ঋণ ও রাজস্ব আয় সব সূচকের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। আমাদের অর্থনীতিতে এসব সংকট কেন তৈরি হয়েছে? এর বেশকিছু কারণ রয়েছে। আমাদের ২০টি মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে গড়ে বছরে জিডিপির ১ শতাংশ করে ব্যয় করা হয়েছে। ২০ মেগা প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১ দশমিক ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে বঞ্চিত করে মেগাপ্রকল্প করা হয়েছে এ প্রত্যাশায় যে, এগুলো অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। কিন্তু এসব প্রকল্প অনেকগুলোই অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর বা যৌক্তিক নয় বলে প্রকাশ পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কিংবা মাতারবাড়ী প্রকল্প ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র ও খুব একটা লাভজনক হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। গত দশকে মানবসম্পদ লাভের বিপরীতে ভৌত অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিয়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফল পরবর্তী ১০ বছর ধরে ভোগ করতে হবে।

এসব প্রকল্পের অবদানকে যদি প্রবৃদ্দি বলা হয়, তাহলে ধরতে হবে এখান থেকে আয় এসেছে। আয় হলে কর আসার কথা। কিন্তু কর হলো আমাদের জিডিপির মাত্র ৯ শতাংশ। জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ সরকারি ব্যয়, যার মধ্যে ৯ শতাংশ মতো কর থেকে আসে বাকি ৫ থেকে ৬ শতাংশ থাকে ঘাটতি। সরকার এই ঘাটতির প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ দিয়ে পূরণ করে, যার ২ শতাংশ অনুদান। বাকি ৬০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। কিন্তু এটাতো সরকারকে ফেরত দিতে হয় সুদসহ। রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ ব্যয় হয় সুদ পরিশোধ বাবদ। এটা হলো আমাদের দৃশ্যমান উন্নয়ন ধারার অন্যতম সমস্যা। এ দৃশ্যমান উন্নয়ন থেকে সরকার এখনো আয় করতে পারেছ না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে যে সংকট চলছে, তার অন্যতম কারণ হলো স্বল্পমেয়াদি আমানতের টাকায় দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্পে হাত নেওয়া হয়েছে। বড় প্রকল্প গুলোর কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। ফলে ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটা দেশের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত, প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এ সংকটের পিছনে রয়েছে আমাদের পরিকল্পনার দুর্বলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা ও কিছু উদ্যোক্তর শ্রেণিস্বার্থ ভুলে গিয়ে রাজনৈতিক সংশ্লেষের মধ্যে ঢুকে যাওয়া, ভর্তুকি ও বিভিন্ন ভাতা বণ্টনে স্থানীয় জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটানো।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আমাদের বড় অন্তরায় দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। দুর্নীতির কারণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কোটি ডলার লোকশান দেয়। দুর্নীতির কারণে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ তৈরি হয়। সরকারের ঋণ বাড়ে, সমাজের টার্গেট গ্রুপ তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়। জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি তৈরি হয়। দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়। এই ধারা থেকে অর্থনীতিকে ফেরাতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় টেকশই উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

কেউ কেউ বলেছিলেন ‘উন্নয়ন আগে, মানবাধিকার পরে’ টেকসই উন্নয়নের জন্য এ ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, তা মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের যে ঝুঁকিগুলো আছে, তার মধ্যে প্রধানতম অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। এছাড়া আয়বৈষম্য তো আছেই। আমাদের জনসংখ্যা অনেক, কিন্তু তাদের দক্ষতা কম, এর সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা আছে। এগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, ভূমি ব্যবহারে দূষণ দূর করা। এগুলো যদি ঠিকভাবে পূরণ না হয় তাহলে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব না।

গত ৫১ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা। যে কোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিহত করতে হবে। এর সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামনে যে উন্নয়ন বিচ্যুতি ছিল, চ্যালেঞ্জগুলো ছিল তা আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে।

এজন্য আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রবৃদ্ধি গতিকে সুসংহত ও ত্বরাণিত করতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের অপর্যাপ্ত কর্মসংসংস্থান সমস্যা মোকাবিলায় উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনই হবে প্রধান হাতিয়ার। সাথে সাথে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হবে। আমাদের অগ্রগতি বিঘ্নিত হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত