ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ ২০২৫, ১৩ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

ভাই কখন ও আপন হয় না

হাসান আলী
ভাই কখন  ও  আপন হয় না

আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবিল এবং কাবিল। কাবিল হত্যা করে হাবিলকে। এভাবেই পৃথিবীতে প্রথম রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বিবাদ সৃষ্টি হয়। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্ররা তাদের ছোট ভাই হযরত ইউসুফ (আ.) কে শিশু বয়সে হত্যার উদ্দেশ্যে গভীর কূপের ফেলে দেয়। অটোমন সাম্রাজ্যে ১৫৯৫ সালে সুলতান মুরাতের (৩য়) মৃত্যুর পর তার সিংহাসনের ক্ষমতা পুত্র মেহমেতের হাতে অর্পণ করা হয়। সুলতান মেহমেত (তৃতীয়) রাজপ্রাসাদে থাকা ১৯ জন রাজকুমারকে হত্যা করে যারা ছিল তার ভাই।

ভারতের মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে সম্রাট আওরঙ্গজেব তার সব ভাইদের হত্যা করে এবং বৃদ্ধ পিতাকে আমৃত্যু বন্দী করে রাখে। লঙ্কার রাজা রাবন তার সৎ ভাই কুবেরের কাছ থেকে লঙ্কা রাজ্য দখল করে নিয়েছে। রাবনের সাথে লঙ্কায় ভগবান রামের যুদ্ধের সময় বিভীষণ রামের পক্ষ অবলম্বন করে। বিভীষণ ছিল রামের আপন ছোট ভাই।

কর্ণ মহাভারতে বর্ণিত সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের অন্যতম। তিনিই ছিলেন একমাত্র যোদ্ধা যিনি মহা ভারতের অপর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা অর্জুনকে যুদ্ধে পরাজিত করতে সক্ষম ছিলেন। কর্ণ ছিলেন সূর্য দেব ও কুন্তীর সন্তান এবং সেই সূত্রে পান্ডবদের বড় ভাই। ভাগ্যচক্রে কৌরব রাজকুমার দুর্যোধনের ঘনিষ্ঠতম মিত্রে পরিনত হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি কৌরবদের পক্ষে নিজ ভাই পান্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন? এবং নিহত হন। কর্ণের শেষ কৃত্য সম্পাদন করে দুর্যোধন।

জার্মানীর ডেসলার ব্রাদার্স সু ফ্যাক্টরির মালিক ছিলেন রুডলফ ও অ্যাডলফ নামের দুই ভাই। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ শুরু হলে তারা আলাদা হয়ে যান। রুডলফ তৈরি করেন সুমা ব্র্যান্ড আর অ্যাডলফ তৈরি করেন এডিডাস ব্র্যান্ড। সু-ফ্যাক্টরী ভাগাভাগির দিন দুই ভাই মুখোমুখি বসে ছিলেন তারপর আর কোনদিন তাদের দেখা কিংবা কথা হয়নি। এক?ই কবরস্থানে সমাহিত হতে দুই ভাই আপত্তি করেছিলেন ফলে তাদের দুজনকে আলাদা আলাদা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

গ্রীক মিথলজিতে বিবাহিতা ইফিমেডিয়া প্রেমে পড়েন সমুদ্র দেব পসাইডনের সাথে। তাদের মিলনে জন্ম লাভ করে জমজ পুত্র এফিয়ালটেস এবং ওটাস। দেবী আর্টিমিসের সাথে কে আগে মিলিত হবে এই দ্বন্দ্বের কারণে একে অপরকে তীর নিক্ষেপে হত্যা করে। অ্যাট্রিয়াস গ্রীক মিথলজিতে পেলোপসের পুত্র। অ্যাট্রিয়াস মাইসিনের রাজা হন এবং তার ভাই থিয়েস্টেসকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেন। ভারতের মধ?্য প্রদেশে দুই ভাইয়ের ঝগড়া এমন অবস্থায় পৌঁছে যে পিতার শেষ কৃত্য সম্পাদনে লাশ সমান দুই ভাগে ভাগ করে দেবার দাবি উঠে। ধ্যানী সিং ঘোষ (৮৪) থাকতেন ছোট ছেলে দেশরাজের সাথে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে ধ্যানী সিং ঘোষের শেষ কৃত্য সম্পাদনের সুযোগ পায় ছোট ছেলে দেশরাজ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের এক ছেলে আরেক ছেলেকে হত্যা করে। এক?ই মায়ের পেটে জন্ম হলেও স্বার্থের দ্বন্দ্বে একে অপরের শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। জন্মের পর থেকেই একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। শৈশবে-কৈশোরে খাবার দাবার, জামা জুতা, খেলার সরঞ্জাম, ব?ইপত্র, কাগজ-কলম নিয়ে মনোমালিন্য শুরু হয়। পরিবারের সিনিয়র সদস্যরা বাচ্চাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে, শাসন করে, ধমক দিয়ে, মারধর করে নিয়ন্ত্রণে রাখে। সাময়িকভাবে কিছুটা দমে গেলেও মনের মধ্যে রাগ ক্ষোভ পুষতে থাকে। কম বয়সে ভাইকে দরকার সাহায্য পেতে, ভয় কাটাতে, খেলার সঙ্গী হিসেবে, নিঃসঙ্গতা দূরীকরণে, ঝগড়া বিবাদ করতে, মা-বাবাকে ফাঁকি দিতে, শক্তিশালী ভাব বজায় রাখতে। বয়স বাড়তে শুরু করলে, নির্ভরতা কাটতে থাকলে, স্বাধীনতার ছোঁয়া পেলে ভাইয়ের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে।একটা সময়ে আমাদের পরিবারে ভাই বোনের সংখ্যা বেশি ছিল।বড় ছেলে মা বাবা, পরিবার পরিজনের স্নেহ মমতা, আদর সোহাগে একচেটিয়া অধিকার পেয়ে থাকে। মেজো ছেলে জন্মের পর বড় ছেলে মা বাবার মনযোগ, স্নেহ মমতা, আদর সোহাগ থেকে খানিকটা বঞ্চিত হতে থাকে। সেজো ছেলে জন্ম লাভের পর মেজো তার অবস্থান ধরে রাখতে বড় ভাই ও ছোট ভাইয়ের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে উঠে। সংসারে বড় ছেলেরা সাধারণত গড় মানের হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় ভাই পিতার সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করে। লেখা পড়া আয় রোজগারে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। বেশিরভাগ পরিবারে মেজো ছেলে আয় রোজগারে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিবাকরি, লেখাপড়ায়, পদপদবিতে খুব?ই ভালো অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রম হিসেবে বড় ছেলেরা বড় জায়গায় থাকতে দেখা যায়। একেইভাবে সেজো, ছোটরা কোন কোন ক্ষেত্রে অনেক ভালো কিছু করে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত