কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টের দূরত্ব অনুমানিক দেড় কিলোমিটার। এই দূরত্বের মধ্যে সৈকতের সী গাল, সুগন্ধা নামের আরও দুই পয়েন্ট রয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে টানা সন্ধ্যা পর্যন্ত এই দেড় কিলোমিটার এলাকা মুখরিত ছিল পর্যটকের উচ্ছ্বাসে। দুপুরে একটু গরম থাকলেও ওই গরম কোনো পর্যটকের ক্লান্তির কারণ হতে পারেনি। সৈকতের শীতল হওয়া আর নীল জলরাশির স্রোতে শরীর ভিজিয়ে যেন মুছে দিয়েছেন যান্ত্রিক জীবনের সকল গ্লানি। সাগরে স্নান ছাড়াও পর্যটকরা নিজেদের মতো আনন্দের উচ্ছ্বাসে মেতে ছিলেন। কিটকটে (বীচ ছাতা) বসে দিগন্ত বিহীন সাগরের জলের খেলা আর হাওয়া উপভোগ করেছেন যেমন। তেমনি সৈকতের বালিয়াড়িতে ছোটাছুটি, বীচ বাইক, ওয়াটার বাইক, ঘোড়ায় চড়ে মুঠোফোনে ছবি তুলে স্মৃতির বাঁধনে রেখেছেন অনেকেই। ঈদের তৃতীয় দিন বুধবার সৈকতে দেখা মিলেছে পর্যটকের এমন উচ্ছ্বাস। সবক’টি পয়েন্ট পর্যটকের উপস্থিতিতে ছিল লোকারণ্য। আর এই উচ্ছ্বাসে পর্যটকের ভোগান্তি বা বিরক্তের কারণ ছিল আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ ভাড়া, অভ্যন্তরিণ যাতায়ত, বিভিন্ন খাবার দোকানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়। যদিও লাখের অধিক পর্যটকের আগমণের কারণে এমন অতিরিক্ত অর্থ আদায় বলে নিজকে সান্ত¦না দিতে দেখা গেছে অনেক পর্যটককে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের প্রথম দিন ৩১ মার্চ সোমবার ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যটকের দেখা মিলেছে। কিন্তু ঈদের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার এই পর্যটকের সংখ্যা লাখ অতিক্রম করেছে। আর বুধবার তৃতীয় দিন এসে ১ লাখ ৬০ থেকে ৭০ হাজার পর্যটক এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কক্সবাজার আবাসিক হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কক্সবাজার শহরের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, রিসোর্টের সংখ্যা সাড়ে ৫ শতাধিক। যেখানে কক্ষ বিবেচনায় প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করার সুযোগ রয়েছে। বুধবার এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ কক্ষই বুকিং রয়েছে। যেখানে অনুমানিক পর্যটকের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকরা আসছেন। আর এই ৫ দিনে অনুমানিক সাড়ে ৭ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণে আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পর্যটক বাড়লে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন স্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। হোটেল মালিকদের বলা আছে যেন প্রতি হোটেলের কক্ষভাড়ার তালিকা টানানো থাকে। পর্যটকদের তালিকা দেখে কক্ষভাড়া পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া থাকে। যদি এমন নিদের্শনা না মানার অভিযোগ থাকে তদন্ত করে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। কক্সবাজার কলাতলী হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, বুধবার থেকে শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল রিসোর্টে থাকার জায়গা হচ্ছে না। মাঝারি আকারের কিছু হোটেলে ৫-৭ শতাংশ কক্ষ খালি থাকলেও তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টের কোনো কক্ষ খালি নেই। এতে অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন। এ ব্যাপারে সর্তক রয়েছেন।
সৈকতে ঘুরে বেড়ানো ঢাকা থেকে আসা সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সৈকতে ভ্রমণ যতটা আনন্দ বা উচ্ছ্বাসের। অতিরিক্ত অর্থ আদায় তেমন বিরক্তের। আবাসিক যে হোটেলটিতে উঠেছেন ওটাতে গত ডিসেম্বর কক্ষ ভাড়া নিয়েছেন সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এবার অগ্রীম বুকিং দেয়ার পরও তা সাড়ে ৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। একই সংখ্যা রেস্তোরাঁতে খাবার দামও অতিরিক্ত নিচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এমনটা মেনে নিচ্ছেন। শিক্ষক আবেদিন নাহিদ জানান, কক্সবাজারে আসা মানেই আনন্দ। এখানের অথৈ নীল জলরাশি আর শীতল হাওয়ায় মন থেকে ক্লান্তির অবসান হয়ে যায়। ফিরে নিজের কর্মস্থলে সজীবতা পাওয়া যায়। রাজশাহীর ব্যবসায় রফিকুল আনোয়ার জানান, সমুদ্র, পাহাড়, ঝর্ণা, বৌদ্ধ বিহার আর প্রকৃতিতে কক্সবাজার সত্যি বিমুগ্ধ করে মনকে। আর আগত পর্যটকের বেশিভাগই ব্যস্ত সমুদ্র স্নানে। তাই সমুদ্রস্নানে নেমে কোনো পর্যটক যেন বিপদাপন্ন পরিস্থিতিতে না পড়েন সেজন্য সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে লাইফগার্ড সদস্যরা। আর গোসলের জন্য পর্যটকদের নির্দেশনা মেনে সাগরে নামার পরামর্শ তাদের। এমনটাই জানিয়েছেন সী সেইফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি। তিনি বলেন, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কম হলে লাখো পর্যটক সমুদ্রসৈকতে এসেছেন। যারা বেশিভাগই পানিতে নেমেছেন স্নান করেছেন। পর্যটক হয়রানি রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সোহেল। তিনি জানান, সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের পাথুরে সৈকত, শহরের বার্মিজ মার্কেট, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক এবং রামুর বৌদ্ধ বিহারসহ কক্সবাজারের বিনোদন কেন্দ্রগুলো পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। সবখানেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি জেলা পুলিশের টহলও রয়েছে। বসনো হয়েছে অভিযোগ কেন্দ্র। পর্যটকের কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন মিলে দ্রুত সমাধন করা হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চুরি-ছিনতাইরোধে শহরের অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যানজটের নিরসন এবং পর্যটকের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ঈদের ছুটিতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া এবং রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের দাম যেন বেশি আদায় করা না হয়, সেসব তদারকির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।