ঢাকা শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

রমজানের শেষ দশকের আমল

শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মদ আল কাসিম
রমজানের শেষ দশকের আমল

কল্যাণ ও বরকতময় সময়ের ঋতুগুলো পাওয়া আল্লাহর অন্যতম বিশেষ নেয়ামত। যেসব সময়ে সৎকর্মের প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়, সে সময়ের আগমন প্রমাণ করে, আল্লাহ তার বান্দাদের ভালোবাসেন ও কল্যাণ কামনা করেন। বান্দা যতই দীর্ঘজীবি হোক না কেন, বস্তুত তার আয়ু সংক্ষিপ্ত। কল্যাণের মৌসুমগুলোতে প্রতিদান অনেক গুণ বৃদ্ধি করা হয়, যা বান্দার আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং প্রশস্ততার সমান।

রমজানের শেষ দশক বরকতময় হোক : বান্দার জন্য আল্লাহ যেসব মৌসুম নির্ধারণ করেছেন, তার মর্যাদা ও তাৎপর্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে বান্দার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমন সময়ের শেষের পরিপূর্ণতা, শুরুর ত্রুটি-বিচ্যুতি নয়। কেননা, আমল নির্ভর করে তার সর্বশেষ অবস্থার ওপর। যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল এবং আল্লাহ তাকে সিয়াম সাধনা করার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা দান করেছেন, মূলত তাকে এমন নেয়ামত দেয়া হলো, যা থেকে সৃষ্টিজীবের অনেকেই বঞ্চিত। রমজানের শেষ দশক পাওয়াটা এতই সৌভাগ্যের বিষয় যে, যদি কেউ এ দশকের হক সঠিকভাবে আদায় করতে না পারে, তাহলে বড় আফসোস হয়। যেহেতু তাকে এমন সুযোগ দেয়া হয়েছে, যাতে কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। গোনাহ মাফের প্রার্থনা করা হয়। যা ঘাটতি হয়েছে, তা পূরণ করা যায়। ত্রুটি সংশোধন করা যায়। এছাড়া এমন সব সৎ আমল করা যায়, যা জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে। রমজানের শেষ দশক এ মাসের মুকুটতুল্য, উপসংহার এবং সাফল্যের মালা পরিধানের মাধ্যম।

ইবাদতের উত্তম সময় : এ সময়ের ইবাদত বছরের অন্য সময়ের ইবাদতের তুলনায় উত্তম। এ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর তথা ভাগ্যরজনী। যে রাতে আল্লাহতায়ালা পূর্ণ মহাগ্রন্থ আল কোরআন পৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘লাইলাতুল কদরে আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা কদর : ১)। এ রাত অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও মর্যাদাপূর্ণ রজনী। এ রাত বরকতপূর্ণ ও সমূহ কল্যাণের। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি বরকতময় রাতে কোরআন অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।’ (সুরা দুখান : ১)। এটি নেক আমলের রাত। এ রাতে আমলের মর্যাদা ও তাৎপর্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। এ রাতে একবার তাসবিহ পাঠের ফজিলত অনুমান করা সম্ভব নয়। এর সওয়াব কত পরিমাণ, নির্ধারণ করা অসম্ভব। এ রাতের এক রাকাত সালাত বহু বছরের ইবাদতের সমান। যে ব্যক্তি এ রাত অন্বেষণ করে ভালো আমল করল, বস্তুত সে অনেক বেশি বরকত লাভে ধন্য হলো। যেন তাকে এমন সুদীর্ঘ আয়ু দেয়া হলো, যার পুরোটাই সে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে কাটিয়েছে।

শবেকদরে আল্লাহ ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন : এ রাতে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির মাঝে চূড়ান্ত গ্রহণ করেন। বান্দার পুরো এক বছরের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। এরপর লওহে মাহফুজ থেকে পুরো এক বছরের যাবতীয় সিদ্ধান্ত-সংশ্লিষ্ট লিপিকার ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়। এই এক বছরের আয়ু, রিজিক ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় এতে লেখা থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।’ (সুরা দুখান : ৪)। এ রাতের বরকতের কারণে আল্লাহর নির্দেশে ব্যাপকহারে ফেরেশতারা আসমান থেকে অবতরণ করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ রাতে আল্লাহর নির্দেশক্রমে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও জিবরাইল অবতীর্ণ হয়।’ (সুরা কদর : ৪)। ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘রহমত ও বরকতের পাশাপাশি ফেরেশতারাও অবতরণ করেন। তারা কোরআনের মজলিসে উপস্থিত বান্দাদের যেভাবে রহমতের ঘেরায় বেষ্টিত রাখেন এবং কোরআনের ছাত্রদের সম্মানে নিজেদের ডানাগুলো যেভাবে বিছিয়ে দেন, ঠিক সেভাবে বান্দাকে রহমত ও বরকতের চাদরে আবৃত রাখেন।

শবেকদর ক্ষমার রাত : বিশাল প্রতিদানের ওপর আস্থা রেখে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করলে সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাত জেগে ইবাদত করে, তার অতীতের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (বোখারি : ২০১৪)। রাত জাগার মানে রাতে সালাত আদায় করা, দোয়া-জিকর করা কিংবা ইস্তেগফার পড়া ইত্যাদি।

শবেকদর লাভে ব্যর্থরা দুর্ভাগা : যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ পেল না, সে বহু কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজানে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এর থেকে যে বঞ্চিত হয়, সে বহু কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।’ (সুনানে নাসাঈ : ২১০৬)। লাইলাতুল কদরের ফজিলতের জন্য রাসুল (সা.) শেষ দশকে এ রাত তালাশ করতেন। সাহাবিদের তা অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করতেন। তবে কদরের রাত শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

রাসুল (সা.) যেভাবে শবেকদর তালাশ করতেন : রাসুল (সা.) লাইলাতুল কদর অন্বেষণে একবার প্রথম দশকে ইতেকাফ করেছেন। এরপর দ্বিতীয় দশকে ইতেকাফ করেছেন। অবশেষে যখন জানতে পারলেন, লাইলাতুল কদর এ দশকেই, তখন থেকে তিনি শেষ দশকে ইতেকাফ করেছেন।

শবেকদরে রাসুল (সা.) এর ইবাদত : রাসুল (সা.) এ দশকে অধিক পরিমাণ ইবাদত করতেন। রাতের বেশিরভাগ সময় সালাত, দোয়া-জিকির এবং কোরআন তেলাওয়াত করে কাটাতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে এত বেশি ইবাদত করতেন, যা তিনি অন্য সময়ে করতেন না।’ (মুসলিম : ১১৭৫)। রাসুল (সা.) শেষ দশকে জাগতিক বিষয়ে ব্যস্ততা কমিয়ে দিতেন। লোকদের থেকে আলাদা হয়ে যেতেন। তিনি রাতে পরিবারের লোকদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন, যেন তারাও এ রাতসমূহের বরকত লাভের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করতে পারে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে রাসুল (সা.) নিজে রাত জাগতেন, পরিবারের অন্যদের জাগিয়ে দিতেন, ইবাদতে একনিষ্ঠ হতেন। নিজে কোমর বেঁধে খুব বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন।’ (মুসলিম : ১১৭৫)। রাসুল (স.) প্রতি রমজানে শেষ দশকে ইতেকাফে বসে লাইলাতুল কদর তালাশ করতেন, যাতে তিনি পরিপূর্ণ আন্তরিকতা এবং মনোযোগের সঙ্গে ইবাদত করে লাইলাতুল কদরের ফজিলত লাভ করতে পারেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমৃত্যু রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করেছেন। এরপর তার মৃত্যুর পর তার সহধর্মিনীরা ইতেকাফ করেছেন। (বোখারি : ২০২৬)।

শবেকদর তালাশে ইতেকাফের গুরুত্ব : রাসুল (সা.) যখন ইতেকাফ করতেন, তখন একান্ত মানবিক প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বেরুতেন না। শেষ দশকে ইবাদতের প্রতি খুব বেশি আগ্রহ থাকা চাই। এ সময় দিনে সিয়াম পালন করার পাশাপাশি রাতে জামাতবদ্ধ হয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করা উচিত। যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে শেষ রাকাত পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল আদায় করে, সে সারারাত কিয়ামুল লাইল আদায়ের সওয়াব পায়।

শেষ দশকের আমল : এ দশকে জিকির করা, দোয়া করা, কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকা, নানান উপায়ে দান-সদকা করা, সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ করা, রোজাদারদের ইফতার করানো, অভাবীদের প্রয়োজন মেটানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, পিতামাতার খেদমত করা, প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা ইত্যাদি আমল করা যায়। তাছাড়া রমজানে ওমরা পালন করা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে হজ আদায় করার সমান।

অন্তর পরিষ্কার করুন : এ সময় একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে কৃত অন্যায়ের প্রতি অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি মনে তওবা করা জরুরি। তওবা এবং কোরআনের শিক্ষার মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ করা চাই। কেননা, গোনাহে জর্জরিত অন্তর নিয়ে ইবাদত পালন করলে তেমন কোনো কাজে আসে না। যদি ভেতরটা পরিষ্কার না হয়, তাহলে ইবাদতের কায়িক পরিশ্রম কোনো কাজে আসে না। পূর্বসূরিদের অনেকে খুব ইবাদত করতেন, আবার অনেকে কম করতেন। কিন্তু অন্তর পরিচ্ছন্ন রাখা তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) এবং তার সাহাবিদের নফল ইবাদতের উদ্দেশ্য ছিল অন্তর পবিত্র করা, নিরাপদ করা এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। তারা ইবাদত করতেন আল্লাহর ভয়ে। তার প্রতি ভালোবাসা ও তার মহত্ব প্রকাশে সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন।’ সুতরাং রমজানের শেষ দশকে দিনরাতের কোনো সময়ই অবহেলা করা যাবে না। সারাক্ষণ ইবাদতে লিপ্ত থাকুন। আপনি যদি ইবাদত পালনে দুর্বল হন, তাহলে সতর্ক থাকুন, আল্লাহ যেন আপনাকে এ দশকে অন্তত পাপ কাজ করতে না দেখেন। যারা প্রথম দশকে কিংবা দ্বিতীয় দশকে অবহেলা করেছেন, তারা এখন তওবা করুন। আমল বৃদ্ধি করুন। ইস্তেগফার করুন। মদিনার মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- মুফতি আল মামুন নূর

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত