যানজটমুক্ত, আরামদায়ক ও নিরাপত্তার দিক থেকে নৌপথের জনপ্রিয়তা অনেক পুরনো। সড়ক ও রেলপথ থাকার পরও দেশের অনেক এলাকার মানুষের কাছে নৌপথ এখনও কাঙ্ক্ষিত ও স্বস্তিময় যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তাই এবারের ঈদযাত্রাকে ঘিরে সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি যাত্রী বেড়েছে নৌপথেও। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদের এ সময়ে যাত্রী বেড়েছে ঢাকার সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালেও।
এদিকে নৌপথে ঈদযাত্রাকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও আরামদায়ক করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং নৌ-পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট যাওয়ার রাস্তায় যানজট নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ঘাটে যাত্রী হয়রানি বন্ধ ও যাত্রী সেবা নিশ্চিতকরণ, যথাসময়ে লঞ্চ আসা-যাওয়াসহ নানান উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর আনাগোনা বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বাড়ছে। প্লাটফর্মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। যাত্রীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ঘাট, ওয়াশরুম, ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও বিশ্রামাগার রাখা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চগুলোকে যথাসময়ে ছাড়তে ঘাটকর্মীদের তৎপর হতে দেখা গেছে। চাঁদপুরগামী যাত্রী জাহিদ আহম্মেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য লঞ্চ আমার পছন্দ। সড়কের যানজট এড়িয়ে স্বল্প খরচে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য লঞ্চই সবচেয়ে ভালো মাধ্যম বলে আমি মনে করি। লঞ্চে বেশি মাল নেয়া যায়, হাঁটাচলা ও বিশ্রামের সুযোগ থাকে, যা দীর্ঘযাত্রায় আরামদায়ক।
গত ১৮ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সভায় নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ককে যানজটমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেন। এছাড়া নৌপথে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি দেখতে সদরঘাটসহ নৌরুটের বিভিন্ন স্পটে আকস্মিক পরিদর্শনে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি। সভায় উপদেষ্টা নৌ-দুর্ঘটনা রোধকল্পে ঈদের আগের পাঁচদিন ও পরের পাঁচদিন সার্বক্ষণিক বাল্কহেড (বালুবাহী) চলাচল বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন।
সভায় সদরঘাট টার্মিনাল ও লঞ্চসমূহ হকারমুক্ত রাখা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি আনসারসহ কমিউনিটি পুলিশের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী ও যানবাহনসমূহকে ফেরি ও যাত্রীবাহী জাহাজে সার্বক্ষণিক সেবা দেয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিসির কন্ট্রোলরুম চালু করা হয়েছে। ঈদযাত্রাকে ঘিরে মন্ত্রণালয়ের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে লঞ্চ মালিক সমিতি। লঞ্চে যাত্রী সেবা নিশ্চিতকরণ, মাঝপথে যাত্রী উঠা-নামা না করানো, লঞ্চে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, বয়ার রাখাসহ যাত্রী সেবা নির্বিঘ্ন করতে সতর্কভাবে কাজ করছে তারা। ঈদযাত্রাকে ঘিরে যাত্রীদের আকর্ষণ করতে তারা সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। যাত্রীদের কোন ভোগান্তি যেন না হয় সেটি নিয়ে বেশ তৎপর লঞ্চ মালিকরা। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী পারাবত-২ লঞ্চের ম্যানেজার সুমন বলেন, এখন যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে যাত্রীর চাপ নেই। দুই-তিন দিন পর যাত্রীর চাপ বাড়বে। আমাদের ডেকে সরকারি ভাড়া ৪০০ টাকা হলেও আমরা ৩০০ করে নিচ্ছি যাতে যাত্রীরা আমাদের লঞ্চে আসে। লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামাল বাদল বলেন, বর্তমানে ১০০টিরও বেশি লঞ্চ নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। শুধু ঢাকা বরিশাল রুটে বর্তমানে ১৮টি লঞ্চ চলাচল করছে। এবারের ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় আমরা বেশি যাত্রী পরিবহন করতে পারব বলে আশাবাদী। যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিতে আমরা নানা ব্যবস্থা নিয়েছি। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’
ঈদযাত্রা ঘিরে যাত্রীদের যে কোনো ধরনের হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রীবহন এবং নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। লঞ্চের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি যাত্রীবাহী লঞ্চে ৪ জন করে স্বশস্ত্র আনসার রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নৌপথ মন্ত্রণালয়। সন্ত্রাস ও ডাকাত প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নৌ-পুলিশ কোস্ট গার্ডের আলাদা টহল ও সারাদেশে নৌ-পুলিশের ৯৪২জন অতিরিক্ত সদস্যকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক কুসুম দেওয়ান।
তিনি বলেন, ঈদযাত্রাকে অধিক নিরাপদ করতে নৌ-পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঈদের পাঁচদিন আগে ও পরে দেশের সব টার্মিনালে নৌ-পুলিশের আলাদা তদারকি থাকবে। ঈদযাত্রা ঘিরে নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই। ঈদযাত্রাকে অধিক নিরাপদ করতে কাজ করবে নৌ-পুলিশ। এদিকে ঈদযাত্রাকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা নদী বন্দর (সদরঘাট) প্রশাসন। বিআইডব্লিউটি-এর নৌ-নিরাপত্তা ট্রাফিকব্যবস্থা বিভাগের ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দশনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সদরঘাটে সকল অংশীদারের সঙ্গে মিটিং করেছি। বর্তমানে থাকা ৩৮টি রুটেই লঞ্চ চালানোর সময়সীমা নির্ধারণ করেছি। আমরা ঈদযাত্রাকে ঘিরে ১৭৫টি লঞ্চের সময়সীমা ঠিক করেছি। যাত্রী বাড়লে প্রয়োজনে লঞ্চ আরও বাড়াবো। যাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের সচেতনতা ও দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য সবসময় আমাদের বন্দরকর্মীরা সহায়তা করবে।