ঢাকা শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

ভিন্ন পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত

ভিন্ন পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত

সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে এবার সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ আনন্দের দিন হলেও বিগত বছরগুলোতে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব পালনে ছিল নানা বিধি-নিষেধ তথা কড়াকড়ি। ছিল ভয়, শঙ্কা ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জন্য দিনটি বয়ে আনত চাপা কষ্টের ও আতঙ্কের। কারণ উৎসবের দিনেও তারা পরিবারের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দিনটি উদযাপন করতে পারেননি। অনেকের ঈদ কেটেছে জেলখানায়। আবার অনেকে ছিলেন গুম, কেউ কেউ হয়েছে খুন। ফলে এসব পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদ চাপা কষ্টের কারণ হয়ে দেখা দিত।গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশে এখন অবারিত স্বাধীনতা বিরাজ করছে। আর তার মধ্যেই এসেছে প্রথম ঈদ। ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-নগর কিংবা গ্রামাঞ্চলে ঈদুল ফিতরকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল, আতশবাজি ও অন্যান্য আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে ওঠে মানুষ। ঈদের দিনেও রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার উদ্যোগে ঈদ সেলিব্রেশনে নানা কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় গত সোমবার ঈদুল ফিতর উদ্?যাপনের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় সামাজিক মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। রেডিও-টেলিভিশনে, বেজে উঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কালজয়ী গান, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ সোমবার সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ঈদের আনুষ্ঠানিকতা। কুশল বিনিময়, কোলাকুলি, স্বজনের কবর জিয়ারত, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখা ও একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সময় পার করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।

রমজান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সুসংবাদ নিয়ে আসে। মুসলমানরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালান। পার্থিব জীবনে মুসলমানদের জন্য এটা অনেক বড় আনন্দের বিষয়। আরও আনন্দের বিষয় হচ্ছে মাহে রমজান শেষে খুশির ঈদ। কারণ এই ঈদ ফিতরা দিয়ে গরিবের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। ঈদ ধনী-গরিবের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করে।

রাজধানীতে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৮টায়। গত শনিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক শাহজাহান মিয়া সাংবাদিকদের জানান, এবার জাতীয় ঈদগাহে একসঙ্গে ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নারীদের জন্য নামাজের আলাদা জায়গা করা হয়। মুসল্লিদের জন্য অজু করার জায়গা, শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাও রাখা হয়। জাতীয় ঈদগাহে নামাজ আদায় করার জন্য আরামদায়ক কার্পেট বিছানো হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সহায়তার জন্য দুটি মেডিকেল টিমও থাকে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বরাবরের মতোই ঈদুল ফিতরের পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামাত শুরু হয় সকাল ৭টায়, দ্বিতীয় জামাত ৮টায়, তৃতীয় জামাত ৯টায়, চতুর্থ জামাত ১০টায় এবং শেষ জামাত অনুষ্ঠিত হয় বেলা পৌনে ১১টায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রথম জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মুহিববুল্লাহিল বাকী।

ঢাকা উত্তর সিটির উদ্যোগে পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ঈদ জামাত। সেখান থেকে বের করা হয় ঈদ আনন্দ মিছিল। হয় ঈদ মেলাও। সংসদ ভবন এলাকায় সাংস্কৃতিক উৎসবেরও আয়োজন করা হয়। এছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে ঈদগাহ ও পাড়া-মহল্লার জামে মসজিদগুলোতে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবমিলিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর প্রথমবারের মতো দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে, নিজেদের ইচ্ছামতো ধর্মীয় ও স্থানীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ঈদ উদযাপন করেছে।

জাতীয় মসজিদে দেশ-জাতি ও ফিলিস্তিনের জন্য বিশেষ দোয়া: জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদের নামাজের পর বিশেষ দোয়ায় দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা এবং ফিলিস্তিনে নির্যাতিত মুসলিমদের ওপর আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা হয়েছে। গত সোমবার সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররমে প্রথম জামাত শুরু হয়। মোনাজাতের মাধ্যমে নামাজ শেষ হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। নামাজের ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মুহিববুল্লাহিল বাকী। নামাজ শেষে তিনি মোনাজাত পরিচালনা করেন।

মোনাজাতে গাজাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্তি, দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য দোয়া করা হয়। মুসল্লিদের ঈদুল ফিতরের আনন্দকে আরো অর্থবহ করতে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

প্রধান উপদেষ্টার ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। গত সোমবার বিকালে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। রাজনীতিবিদ, চাকরিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিকসহ নানা পেশার মানুষ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা পরিষদ, বিশেষ সহকারীরা, হাই রিপ্রেজেন্টেটিভরা ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী, আন্দোলনে শহিদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ।

এছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে ছিলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আমির আবদুল বাসিত আজাদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজসহ আরও অনেকে।

বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে ছিলেন- মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, পাকিস্তানের হাইকমিশনার সৈয়দ আহমেদ মারুফ, কাতারের রাষ্ট্রদূত সেরায়া আলি আল-কাহতানিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তারা। গত সোমবার রাত ৯টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ আয়োজন করা হয়। বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু চৌধুরী, ইকবাল মাহমুদ টুকু, জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন- ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক, গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কেএম ফজলুল হক মিলন, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকসহ অনেকে।

এছাড়া পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত সোমবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের কবরে দলের দলটির নেতৃবৃন্দ সুরা-ফতেহা পাঠ ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করেন। এসময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটি সদস্যসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও ঢাকা মহানগর বিএনপি, ছাত্রদলসহ অঙ্গ সংগঠন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কুশল বিনিময়ে ঈদ কাটালেন জামায়াত আমির: জুলাই আন্দোলনে শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে দিন কাটিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত সোমবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাতে নামাজ শেষে শহিদদের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাতে যাওয়া শুরু করেন তিনি। এদিন নামাজের পর জুলাই আন্দোলনের শহিদ ফারহানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির। তিনি শহিদ ফারহানের মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শহিদ ফারহানের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।

একই দিন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের হামলায় শহিদ হওয়া সাইফুল্লাহ মো. মাসুম ও হাফেজ শিপনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি শহিদ মাসুম ও শিপনের মা, বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন এবং পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন।

পরে ওই দিন বিকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন।

এছাড়া জুলাই আন্দোলনের শহিদ পিকআপ ভ্যানচালক রানা তালুকদারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার মাতা, স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর নেন।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আরেক শহিদ জুবায়েরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ডা. শফিকুর রহমান। একই দিন জুলাই আন্দোলনের শহিদ আসাদুল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন এবং পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। জামায়াত আমির শহিদ আসাদুল্লাহর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সন্তানকে কোলে তুলে নেন ও পরম স্নেহ-মমতায় আদর করেন।

জুলাই আন্দোলনে পানি বিতরণ করার সময় শহিদ মীর মুগ্ধের বাসায়ও যান তিনি। সেখানে মুগ্ধের বাবা, ছোট ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন।

শহিদ তামীম ও শহিদ সিফাতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেন জামায়াত আমির। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলনে যাত্রাবাড়ীতে শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। ধারাবাহিকভাবে যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত শহিদ রবিন মিয়া, শহিদ আহমদ আব্দুল্লাহ, শহিদ ইয়াসির সরকার, শহিদ জিহাদ, শহিদ আব্দুল হান্নান, শহিদ ওয়াসিম শেখ, শহিদ নূর হোসেন, জাহাঙ্গীর খাঁ, শহিদ রানা, শহিদ মিসেস শাহিনুর বেগম, শহিদ ইমন গাজী, শহিদ ইব্রাহিম, শহিদ মিরাজ হোসেন, শহিদ রাকিব ও শহিদ মাসুদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।

দেশবাসীকে এনসিপির ঈদের শুভেচ্ছা: দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন। গত সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এনসিপি নেতারা বলেন, ফ্যাসিবাদ উত্তর বাংলাদেশে এই প্রথম নাগরিকরা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপন করেছেন। বিগত দিনে ঈদের মতো একটি সর্বজনীন উৎসবের আনন্দকেও ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন দল কেড়ে নিয়েছিল। পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে অনেক নাগরিককে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঈদকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই অবদান জুলাইসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহিদদের। তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।

দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের সব নাগরিককে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তারা বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট আমাদের মধ্যে যে সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি নষ্ট করেছে এবারের ঈদে তা পুনরুদ্ধার করতে হবে।

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত: উপমহাদেশের ২৭৫ বছরের বৃহত্তম, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত সোমবার ১৯৮তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮তম শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ (দা: বা:)।

সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ঈদে বরাবরই লাখো লাখো মুসল্লির পদভারে মুখরিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। এবার সেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান যেন আরো নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হলো। পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাতকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মহামিলন কেন্দ্র হয়ে উঠল ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। গত ৩১ মার্চ সোমবার সকাল ১০টায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হলেও সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জনসমুদ্রে পরিণত হয় ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। তখনও চলছিল শোলাকিয়া অভিমুখে মুসল্লিদের ঢল। লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে একত্রিত হওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য শোলাকিয়া অভিমুখে ছুটে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল হৃদয়।

ফলে জামাত শুরুর আগেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ছাড়িয়ে মাঠের আশপাশের রাস্তা, ঈদগাহ পুকুর, শোলাকিয়া সেতু, সেতু পেরিয়ে কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ সড়কে ছড়িয়ে যায় জনস্রোত। তাতেও জায়গা না পেয়ে বাসাবাড়ির ছাদ, উঠান, অদূরের গাছ-বাজার এলাকা এবং বিভিন্ন গলিপথে জামাতের জন্য দাঁড়ান বিপুলসংখ্যক মুসল্লি। স্বভাবতই শোলাকিয়ার ঈদ জামাত হয়ে যায় এক মহাসমুদ্র। লাখো কণ্ঠের আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া ঈদগাহ এলাকা। এত বড় ঈদ জামাত এর আগে কখনও দেখেনি শোলাকিয়ায়। ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার ১৯৮তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বরাবরের মতোই এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা এসে এই জামাতে শরিক হন। প্রাচীন এই ঈদগাহে নামাজ আদায়ের জন্য দুই-তিন দিন আগে থেকেই মুসল্লিরা কিশোরগঞ্জে আসতে শুরু করেন। এবছরও নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত রাখতে অন্তত ছয় লাখ মুসল্লি অংশ নিলেন শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে।

নামাজ আদায় করেন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই। সবার উদ্দেশ্য একটাই, যেন কোনো অবস্থাতেই হাতছাড়া হয়ে না যায় শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে অংশগ্রহণ, হাতছাড়া হয়ে না যায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এ সুবর্ণ সুযোগ। ঈদের আগের রাতে আসা মুসল্লিদের জন্য কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হয় ইফতার ও রাতের খাবারের।

নামাজ শুরুর পাঁচ মিনিট পূর্বে তিন রাউন্ড, তিন মিনিট পূর্বে দুই রাউন্ড এবং এক মিনিট পূর্বে এক রাউন্ড বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে মুসল্লিদের নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সংকেত দেয়া হয়।

গত বছরের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ফরীদ উদ্দীন মাসউদকে বাদ দিয়ে মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত স্থায়ী ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে পুনর্বহাল করেছে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটি। দীর্ঘ ১৫ বছর পর তার এই পুনর্বহাল স্থানীয় মুসল্লিদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। নানা বিধি-নিষেধের গ্যাঁড়াকল পেরিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে প্রথমবারের মতো এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার কারণে এবার মুসল্লির সংখ্যা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। ফ্যাসিবাদী জামানায় মোবাইল ফোন নিয়ে ঈদগাহ মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এবার তা ছিল না। তবে মুসল্লিদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় রেখে এবার ছাতা নিয়ে কেউ ঈদগাহ মাঠে প্রবেশ করতে পারেনি। পুলিশের নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন বিজিবির সদস্যও মোতায়েন ছিল। এছাড়া সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। পুরো শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে ঘিরে মোতায়েন করা ছিল বিপুলসংখ্যক র‌্যাব সদস্য। র‌্যাব-১৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল হাসান বলেন, মুসল্লিদের নিরাপত্তায় সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। নিরাপত্তা জোরদার করতে পোশাকের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। নাশকতাকারী, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, পকেটমার, টিকিট কালোবাজারি ও মলমপার্টিসহ অন্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে ছিল আইনানুগ জোরদার ব্যবস্থা। কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা ছিল।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত