ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

বাংলা-বাঙালির পাখি

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
বাংলা-বাঙালির পাখি

চির সবুজ দেশ হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত আমাদের বাংলাদেশ। যেসব প্রাকৃতিক উপাদান সুজলা-সুফলা এ দেশকে ব্যাপক সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, তার মধ্যে পাখি অন্যতম। নানা প্রজাতির নানা বর্ণের পাখির কলরবে সারাক্ষণ বাংলার প্রকৃতি মুখরিত থাকে। কণ্ঠ-মাধুর্যে যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষের মনোহরণ করে আসছে এ দেশের পাখি। আকাশে সূর্য তার আগমনী বার্তা দেয়ার আগেই পাখি তার মধুর কণ্ঠে স্বাগত জানায় দিনের প্রথম প্রহরকে। পাখির কলকাকলিতে ঘুমভাঙা এ দেশের মানুষের নিত্য ঘটনা। দেশের অনুপম রূপ-বৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ পাখি। এরা নানাভাবে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এদের উপস্থিতি আমাদের প্রাণে আনন্দের স্রোত বইয়ে দেয়। বিচিত্র পাখির বিচিত্র ডাক ও কলরব চারপাশের পরিবেশ মোহময় করে রাখে। বাংলাদেশে পাখিদের সরব বিচরণের কারণেই দেশটা এত সতেজ, সজীব ও প্রাণবন্ত।

বাংলাদেশের পাখি-বৈচিত্র্য : প্রকৃতির অকৃত্রিম সবুজের সমারোহে অন্যরকম এক সৌন্দর্য যোগ করেছে বাংলাদেশের বিচিত্র সব পাখি। এ দেশের সর্বত্র রয়েছে বিভিন্ন পাখির নিয়মিত আনাগোনা। বাংলাদেশে প্রায় ৫৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। তার মধ্যে প্রায় ৪০০ প্রজাতির পাখি এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। বাকিরা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অতিথি হিসেবে এসে প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখে। আর বাংলাদেশের মানুষকে অনাবিল আনন্দ দান করে। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, বন-বাদাড়ে, ঘরের আঙিনা, গাছ-গাছালিতে, খালে-বিলে- সবখানে রয়েছে পাখিদের সমান পদচারণা।

জাতীয় পাখি দোয়েল : দৃষ্টিনন্দন ও মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারী দোয়েল বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। দোয়েলের মতো রূপের বাহার সচরাচর অন্য কোনো পাখির মধ্যে দেখা যায় না। বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে তার শোভা। জাতীয় পাখি হওয়ার সুবাদে এ পাখির সগর্ব বিচরণ রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে। সারা বছরই আমাদের চারপাশে দোয়েল পাখি দেখা যায়। এরা সাধারণত বাগান বা বাড়ির আঙিনার খোলা জায়গায় ঘাসের ওপর চরে বেড়ায়। ছড়ানো-ছিটানো শস্যকণা ও ছোট পোাকামাকড় খেয়ে দোয়েল জীবনধারণ করে।

গৃহপালিত পাখি : বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পাখিপ্রেমী। অনেকেই নিজের বাড়িতে বা বাগানে বিভিন্ন জাতের পাখি পালন করে। যেসব পাখি বাড়িতে পালন করা হয়, তাদের বলা হয় গৃহপালিত পাখি। বাংলাদেশে গৃহপালিত পাখির মধ্যে সবার আগে কবুতরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পাখিপ্রেমীদের অধিকাংশই বাড়িতে কবুতর পালন করে। গৃহপালিত পাখির মধ্যে আরও আছে চড়ুই, পায়রা, বুলবুল, টিয়া, ময়না ইত্যাদি জাতের পাখি।

শিকারি পাখি : যেসব পাখি অন্য কোনো ছোট প্রাণি শিকার করে খায়, তাদের শিকারি পাখি বলা হয়। এ ধরনের পাখির সংখ্যাও বাংলাদেশে প্রচুর। এরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সহজলভ্য প্রাণি ও পোকামাকড় শিকার করে খাবারের যোগান দেয়। এদের মধ্যে চিল, বাজ, ঈগল, মাছরাঙ্গা, পেঁচা, কোড়া ইত্যাদি পাখির নাম উল্লেখযোগ্য।

গায়ক পাখি : বাংলাদেশে গায়ক পাখি হিসেবে প্রধানত পরিচিত হচ্ছে কোকিল। তার মধুর স্বরে কুহুকুহু আওয়াজ মানুষের কানে সুরেলা গানের মতো বাজে। কোকিলকে বলা হয় বসন্তের দূত। কেননা, ঋতুরাজ বসন্তকে আরও মোহনীয় করে তোলে তার সুরেলা কলরব। গায়ক পাখি কোকিলের ডাক শুনে বাংলাদেশের মানুষ বসন্তের আগমন বার্তা পায়। শ্যামা পাখিও গানের পাখি হিসেবে বেশ পরিচিত। গায়ক পাখির মধ্যে আরও রয়েছে বুলবুল পাখি।

জলচর পাখি : বাংলাদেশের গাছগাছালির পাশাপাশি খালে-বিলে ও নদীতে রয়েছে অসংখ্য পাখির পদচারণা। এরা সাধারণত জলে বিচরণ করে বলে তাদের জলচর পাখি বলা হয়। পানিতে অবস্থানরত পোকামাকড়, ছোট মাছ ও খাদ্যকণা খেয়ে এরা জীবনধারণ করে। জলচর পাখির মধ্যে হাঁস অন্যতম। এ ছাড়া পানকৌড়ি, বক, বালিহাঁস, ধনেশ, গাঙ-শালিক, কাদাখোঁচা, গাঙচিল ইত্যাদি পাখি সর্বদা জলে চরে বেড়ায়।

পোষ্য পাখি : বহু পাখি আছে, যারা বশ্যতা মেনে নিয়ে মানুষের সঙ্গে বাস করে। এদের মধ্যে অনেকে আবার মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে কথাও বলতে পারে। বিনোদন ও আনন্দ লাভ এবং সেই সঙ্গে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য মানুষ এদের পোষে। পোষ্য পাখিগুলো সাধারণত খুব অল্প সময়েই তাদের মনিবের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক হয়ে যায়। মনিবকে তারা খুব ভালোভাবে চিনে রাখে। দেখামাত্রই ডাক বা শেখানো বুলি ব্যবহার করে স্বাগত জানায়। পাখি পালন ও পোষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ ও পাখির মধ্যকার ভালোবাসাপূর্ণ একটি সুন্দর সম্পর্কের প্রকাশ পায়। ময়না, টিয়া, চড়ুই, কাকাতুয়া, শ্যামা, ঘুঘু, কবুতর ইত্যাদি বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পোষমানা পাখি।

হিংস্র পাখি : বাংলাদেশে কিছু প্রজাতির পাখি আছে, যারা খুবই সাহসী ও একই সঙ্গে হিংস্র বলে বহুল পরিচিত। এদের মধ্যে শিকারি পাখিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে চিল, বাজ, শকুন ও কাকের নাম সবার আগে চলে আসে। চিল ও বাজ সাধারণত মাংসভোজী। এরা বিচরণরত মাছ, মুরগির বাচ্চা, হাঁসের বাচ্চা ইত্যাদি শিকার করে। এদের মাংস খেয়ে জীবনযাপন করে। শকুনও মাছ খায়। তবে মরা গরু, ছাগল ইত্যাদি এদের প্রিয় খাবার।

বন্য পাখি : বাংলাদেশের প্রকৃতিতে উপকূল ও বনাঞ্চলের একটি অপূর্ব মিতালী দেখা যায়। এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে যেমন একাধিক প্রজাতির জলচর পাখি রয়েছে, তেমনি বনে-জঙ্গলেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ বন্য পাখির বিচরণ। বাংলাদেশের প্রধান বন সুন্দরবনে রয়েছে অগণিত পাখির স্থায়ী আবাস। বনমুরগির ডাকে ঘুম ভাঙে সুন্দরবন এলাকার মানুষের। অসংখ্য পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস। সুন্দরবন দিয়ে প্রবাহিত উচ্ছল নদীর বুকে সাঁতার কাটে গাঙচিল, বালিহাঁস, পানকৌড়িসহ আরও বিভিন্ন জাতের পাখি। এসব অরণ্য পালিত পাখি আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

অতিথি পাখি : বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রকার পাখির পাশাপাশি এ দেশের পরিবেশ মাতিয়ে রাখতে আগমন ঘটে বিভিন্ন জাতের অতিথি পাখির। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সবুজ-শ্যামল এ দেশে বেড়াতে আসে এসব অতিথি পাখি। এরা সাধারণত শীতকালে সুদূর হিমালয় ও সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে উড়ে এসে আমাদের দেশের মনোরম পরিবেশে আশ্রয় নেয়। বসন্তকালের শেষের দিকে আবার যথাস্থানে চলে যায়।

পাখি নিধন : বাংলাদেশের পাখি এ দেশের প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলেও কিছু অসাধু এবং অসচেতন মানুষ প্রতিবছর অনেক পাখি নিধন করে। অনেকে শখের বশে, আবার অনেকে খাওয়ার জন্য পাখি শিকার করে বেড়ায়। এতে একদিকে প্রাণিজগত ধ্বংসের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সৌন্দর্যহানি হচ্ছে। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতি থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার কারণে এ নীতির কেউ তোয়াক্কা করে না। ফলে মানুষের হাতে মারা পড়ছে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ অনেক পাখি। তা ছাড়া অনবরত শিল্পায়নের ফলে দেশে পর্যাপ্ত গাছ-গাছালি ও বনাঞ্চল না থাকায় পাখির উপস্থিতি এখন আগের মতো দেখা যায় না। ধীরে ধীরে লোপ পেতে বসেছে বাংলাদেশের গহীন অরণ্য। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হওয়ার পথে বহু প্রজাতির অগণিত পাখি।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত