১. দেশি ময়ূর : ময়ূর বিলুপ্তপ্রায় পাখি। দীর্ঘদিন এটি দেশের প্রকৃতিতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি প্রকৃতিতে ময়ূর দেখা গেছে। যদিও খুবই বিরল। যেমন- পঞ্চগড়ে ২০২২ সালে দেশি ময়ূরের ছবি তোলা হয়েছে। একশ বছর আগে ঢাকার আশপাশের বনেও ময়ূর ছিল প্রচুর। ময়ূরের একাধিক প্রজাতি বাংলাদেশে ছিল। সবুজ ময়ূর দেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। দেশি ময়ূরের আরেক নাম নীল ময়ূর। এটি বাংলাদেশে সংরক্ষিত ও ভারতের জাতীয় পাখি।
২. ধনেশ : দেশে তিন প্রজাতির ধনেশ রয়েছে। এর মধ্যে পাতাঠুঁটি ধনেশ বিলুপ্ত। বাকি তিন প্রজাতিই দুর্লভ ও বিপন্ন। এর মধ্যে দুটি প্রজাতি- কাও ধনেশ ও রাজ ধনেশ। দুটো পাখিই দেখতে প্রায় কাছাকাছি। রাজ ধনেশ আকারে একটু বড়। বাস করে পাহাড়ি বনের গহিনে কিংবা উঁচু গাছে। শিকার ও পাচারে দেশের রাজকীয় এ পাখি বিলুপ্তির পথে। ধনেশের ঠোঁট অনেক বড় হলেও হালকা। ভেতরটা ফাপা।
৩. সাহেব বুলবুলি : এক অদ্ভুত সুন্দর পাখির নাম সাহেব বুলবুলি। একে দুধরাজ, শাহ বুলবুলি নামেও ডাকা হয়। এর লেজ অতি দীর্ঘ, ফিতার মতো। এ দীর্ঘ লেজ নিয়ে বসা, ওড়া প্রতিটি মুভমেন্টই দর্শনীয়। তার ওপর মাথায় আছে ঝুটি। পাখিটি প্রথমে থাকে কমলা রঙে, পরে রং পাল্টে সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়। মাথা কালো। নারী পাখির অবশ্য লেজ বড় হয় না। ময়মনসিংহ ও বগুড়া জেলায় পাখিটি বেশ দেখা যায়। ঢাকায় বিরল। ব্লাইদের ফ্লাইক্যাচারের সঙ্গে এর বেশ মিল আছে। তবে ব্লাইদের ফ্লাইক্যাচার অধিক বিরল।
৪. কালেম : জলাশয়ের সুন্দরতম পাখি এটি। সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের জলাশয়ের পরিচিত পাখি। এমনকি কেরানিগঞ্জেও এ পাখি দেখা যায়। এর রং চোখ ধাঁধানো নীল। ইদানিং খাচায় পোষা হচ্ছে। যা পাখিটিকে বিপন্ন করবে। বাসায় পোষার চাহিদা পূরণ করতে প্রকৃতি থেকে ধরে আনতে আনতে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক কালেমের দেহের দৈর্ঘ্য ১৫-২০ ইঞ্চি। ওজন ৭০০-৮৫০ গ্রাম। দেহের পালক চকচকে নীলচে বেগুনি। মাথার রং হালকা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। তবে কপালের ওপরের লাল বর্মটি স্ত্রীর ক্ষেত্রে ছোট।
৫. জল ময়ূর : এটি জলাশয়ের পাখি। নেউপিপি, পদ্মপিপি বা মেওয়া নামেও পরিচিত। প্রজননকালে রং পাল্টায়। সাদার ওপর কালো, খয়েরি ও সোনালির রাজকীয় রং ফুটে ওঠে।
৬. বামনরাঙা মাছরাঙা : বাংলাদেশে ১২ প্রজাতির মাছরাঙা আছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিটি মাছরাঙাই অসাধারণ সুন্দর। এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর বামনরাঙা মাছরাঙা। পাখিটি গাছে বসে থাকলে মনে হয়, যেন বহুরঙা ফুল ফুটে আছে। দেশের সবচেয়ে ছোট এ মাছরাঙা পাওয়া যায় সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি বনে। পাখিটি বেশ বিরল। এর দেখা পাওয়া পাখিপ্রেমীদের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার।
৭. মৌটুসি : দেশে ছয় প্রজাতির মৌটুসি দেখা যায়। আরও তিন প্রজাতি বিলুপ্ত বা খুবই বিরল। এ ছয় প্রজাতির মধ্যে সবগুলোই সুন্দর। বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট পাখিগুলোর অন্যতম মৌটুসির বেশিরভাগ দেখা যায় সিলেট বিভাগের বনে। আমাদের আশপাশে বাস করে বেগুনি মৌটুসি। এর পুরো শরীর কালচে বেগুনি। এর ওপর যখন রোদ পড়ে, ঝকমক করে ওঠে। ভ্যান হ্যাসল্টের মৌটুসিকে শুধু মৌটুসি ডাকা হয়। এর মাথায় পান্না রং। গায়ে বেগুনি, কালো, নীল ও লাল রং রয়েছে। সিঁদুরে মৌটুসির মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত সিঁদুরের মতো লাল টকটকে। সিঁদুরে-হলুদ মৌটুসি সিঁদুরে মৌটুসির মতো লাল। তবে পেট পুরো হলুদ। একে বলা যেতে পারে সবচেয়ে সুন্দর মৌটুসি। আর চুনি-মুখি মৌটুসির পেট হলুদ ও পিঠ পান্না ও কালচে। মৌটুসির স্ত্রীপাখি পুরুষপাখির মতো অতটা বর্ণিল ও আকর্ষণীয় হয় না। মৌটুসি ফুলের ভেতরে চিকন লম্বা ঠোঁটটি ঢুকিয়ে মধু খায়। মধু ছাড়াও ছোট পোকা মৌটুসির নিয়মিত খাবার।
৮. টিয়া : টিয়ামাত্রই সুন্দর। বাংলাদেশে সাত প্রজাতির টিয়া আছে। টিয়া নামে আমরা যেটিকে ডাকি, সেটি হলো সবুজ টিয়া। এটি আমাদের সবচেয়ে পরিচিত টিয়া। দোহার-নবাবগঞ্জে একসময় প্রচুর দেখা যেত। এখন অনেক কমে গেলেও টিকে আছে। সবচেয়ে সুন্দর টিয়া বলা যায় হীরামন টিয়াকে। মাথা পাকা আলুবোখারার মতো গোলাপি-লাল। বাসন্তি লটকন টিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট ও দুর্লভ। এর পুরোটাই সবুজ। পিঠে একটু লাল। লেজ ছোট। ধূসর-মাথা টিয়াও বেশ দুলর্ভ। শুধু পাহাড়ি বনে দেখা যায়। সবচেয়ে বড় টিয়ার নাম চন্দনা। এটি বেশ দুলর্ভ। এছাড়া আছে ফুলমাথা টিয়া ও মদনা টিয়া।
৯. মথুরা : নীলচে কালো রঙের শরীর আর মাথায় একটু লাল, তার ওপর ঝুটি, দেখতে কিছুটা মোরগের মতো। এটা হলো মথুরা। এর একটা রাজকীয় ভাব আছে। বিলুপ্তপ্রায় মথুরা সিলেট বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগের বনে দেখা যায়। ফটোগ্রাফাররা এ বহু আকঙ্খিত পাখির ছবি তুলতে ছুটে যান সাতছড়ি বা চট্টগ্রামের বনে।
১০. হুদহুদ : লেখক বনফুল হুদহুদের নাম রেখেছিলেন মোহনচূড়া। পাখিটির শরীর বাদামি। ডানা ও লেজে সাদা-কালো দাগ রয়েছে। মাথায় সুন্দর একটি ঝুটি। সেই ঝুটির হলদে বাদামি পালকের মাথাটা কালো রঙের। উত্তেজিত হলে ঝুটি মেলে দেয়। তখন মুকুটের মতো লাগে। বাদামি পালকের মাথাটা কালো। এটি মেঠো পাখি। গ্রামে ঘরবাড়ির আঙিনায় দেখা যায়। বাসা করে গাছের কুঠরিতে বা পুরনো দেয়ালের ফাঁক-ফোঁকরে। প্রায় সারাদেশেই বাস করে। কোরআনে সোলাইমান (আ.)-এর ঘটনায় এ পাখির উল্লেখ আছে। তাই একে ‘সোলাইমান পাখি’ও ডাকা হয়।