পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নিজের পরিচয় দেন এভাবে- ‘আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আর তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা রুম : ৫৪)।
এই আয়াতে জীবনের পথচলাকে অত্যন্ত সংক্ষেপে ও গভীর অর্থে তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতে মানুষের জীবনের ধাপগুলো চিত্রিত হয়েছে। শৈশবের দুর্বলতা দিয়ে শুরু হয় মানব জীবন, তারপর ধীরে ধীরে দেহে শক্তি সঞ্চারিত হয়। এক পর্যায়ে শক্তি আবার দুর্বলতায় পরিণত হয়। বার্ধক্যের দুর্বলতায় জীবন আবার ফিরে যায় শৈশবের দুর্বলতায়। কী চমৎকার আয়াত! জীবনবোধের নির্দেশনা! এই আয়াত আমাদের জীবনের প্রকৃত সত্য বুঝতে এবং আল্লাহর শক্তি ও কুদরতের প্রতি চিন্তা-ভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি মানুষকে তার অক্ষমতা উপলব্ধি করতে সহায়ক। আয়াতটি জোরালোভাবে নির্দেশ করে- ‘সব সময় আল্লাহর উপর নির্ভরশীল থাকা প্রয়োজন।’
জীবনের প্রথম অধ্যায় শৈশব। এটি নিষ্পাপ, দুর্বল অবস্থায় শুরু হয়। একটি শিশু নিজ থেকে কিছুই করতে পারে না। আল্লাহ তার চারপাশের মানুষের মনে তার প্রতি ভালোবাসা ও মমতা সৃষ্টি করেন এবং তাকে সুরক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। এই সময়ে শিশুটিকে আল্লাহর রহমত ঘিরে রাখে। মানুষ মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে পৃথিবীতে আসে সম্পূর্ণ জ্ঞানের অভাব ও ক্ষমতাহীন অবস্থায়। এরপর মহান আল্লাহ তাকে জ্ঞানার্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট শক্তি ও ইন্দ্রীয়গুলো দান করেন; শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও বুদ্ধিবিবেক। এগুলো দিয়ে সে জ্ঞানার্জন ও জীবনের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দর্শনশক্তি ও হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সুরা নাহল : ৭৮)।
এই বাস্তবতা আমাদের মধ্যে বিনম্রতা সৃষ্টি করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়ায়। মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান বা শক্তি নিয়ে অহংকারী হতে পারে না। কেননা, তার প্রতিটি শক্তি, প্রতিটি অর্জন আল্লাহর দান। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক একটি অনুগ্রহ, যা সর্বদা কৃতজ্ঞতা ও বিনম্রতা দাবি করে। আল্লাহর ধন-সম্পদ অসীম। আর তার বান্দা সবসময়ই তার প্রতি নির্ভরশীল। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকই আল্লাহর দান। সুতরাং, তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা ও তার আদেশের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকা আমাদের কর্তব্য।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারপর তিনি দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন।’ এখানে যৌবনকালের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যৌবনকাল হলো জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়, এটি জীবনের গতি ও উন্নতির শিখর। এই সময়ে মানুষ শক্তি, উদ্যম ও স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্যে ভরপুর থাকে। এটি এমন এক সম্পদ, যার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। এই সময়ে কাজ ও সাফল্যের ময়দানে বড় বড় কীর্তি রচিত হয়, আর সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করা হয়। কোনো দেশ বা জাতি তখনই উন্নতি করে, যখন তাদের যুবসমাজ কর্মঠ ও উচ্চাভিলাষী হয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যুবসমাজের শক্তি তখনই সঠিক পথে পরিচালিত হয়, যখন তা ধর্মীয় নীতিমালার ছায়ায় লালিত হয়। এটি তখনই আরও উন্নত হয়, যখন মূল্যবোধ ও নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। যুবশক্তি যদি দেশ ও মানুষের সেবায় নিবেদিত হয়, তবে তা সত্যিকার অর্থেই মহৎ হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি নিজের যৌবনকাল অপচয় করে, সে তার পুরো জীবনই অপচয় করে। যৌবন একটি অল্প সময়ের সুযোগ, যদি একে কল্যাণ ও উপকারে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা পৃথিবীতে ও পরকালে কল্যাণকর ফলাফল বয়ে আনে। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, যুবশক্তি সঠিক পথে না চললে তা আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হতে পারে। যদি তা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, ইসলামের নীতিমালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও শয়তানের পথ অনুসরণ করে, তাহলে তা ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারপর তিনি দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন।’ এই শক্তি শুধু শরীরের নয়, বরং এটি মনের দৃঢ়তা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অপরাজেয় সংকল্পের সমন্বয়। অনেক সময় শক্তিশালী শরীরও যদি দুর্বল মানসিকতা ও নিষ্ক্রিয় সংকল্প ধারণ করে, তাহলে তা কোনো সাফল্য আনতে পারে না। এ ধরনের যুবক তার যৌবন নষ্ট করে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সে নিজের জীবন বা ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যর্থ হয়। আসল শক্তি হলো সেই শক্তি, যা ঈমান থেকে উৎসারিত হয়। এটি আল্লাহর আনুগত্য, ইস্তিগফার ও সৎকর্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এ শক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত, যা তাকে আরও দৃঢ় ও অটল করে তোলে। মহান আল্লাহ হজরত হুদ (আ.)-এর ভাষায় বলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, এরপর তার দিকেই ফিরে এসো। তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বারিবর্ষণ করবেন। তিনি তোমাদের আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন। তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না।’ (সুরা হুদ : ৫২)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারপর তিনি শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য দিয়েছেন।’ এভাবেই আল্লাহর বিধানে জীবনের চক্র চলতে থাকে। শৈশবের দুর্বলতা দিয়ে শুরু হয়, তারপর আসে যৌবনের শক্তি, অবশেষে বার্ধক্যের দুর্বলতায় পৌঁছে যায়। বার্ধক্যে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, শক্তি কমে যায়, চুল পেকে যায়, হাড় ভেঙে পড়ে, আর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময় ঘনিয়ে আসে। বার্ধক্যের চিহ্নগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী একটি অস্থায়ী জায়গা, আর জীবন যেন এক মায়ার স্বপ্ন। তখন মন ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘হায়, যদি আমার জাতি জানত, দুনিয়া এক অস্থায়ী যাত্রা, যা কারো জন্যই চিরস্থায়ী নয়!
বার্ধক্য একটি নীরব বার্তা, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। এই সময়ে মানুষ তার হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরাতে মনোযোগী হয়। তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা তার জীবনের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়, নিজের হিসাব নিতে শিখে এবং আল্লাহর নৈকট্যকে জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বানায়। বার্ধক্য জীবনের শেষ সুযোগ, যেখানে অতীতের ভুলগুলো শোধরানো যায় ও পরকালীন জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা সহজ হয়। তবে বার্ধক্য মানে দুর্বলতায় পরাজিত হওয়া নয়, কিংবা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নয়। এটি জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যেখানে অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই সময়ে প্রবীণরা তরুণদের পথ দেখায়, তাদের সফলতার মশাল জ্বালায় ও জীবনের দিকনির্দেশনা দেয়। প্রবীণদের কাজ হলো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা ও তাদের মধ্যে আশা ও উদ্যমের সঞ্চার করা। বার্ধক্যের সময় আমল বন্ধ হয় না এবং আল্লাহর দানের ধারা থেমে যায় না, যতক্ষণ হৃদয় ঈমান ও দৃঢ় সংকল্পে পূর্ণ থাকে।
আমলের গুরুত্ব : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সাধারণ আয়ু ষাট থেকে সত্তর বছর। তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই এ বয়স অতিক্রম করবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৩৬) অন্য একটি হাদিসে এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত এসে যায় এ অবস্থায়, আর তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে কেয়ামত হওয়ার আগেই যেন (সম্ভব হলে) সে চারাটি রোপণ করে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১২৯৩৩) উক্ত হাদিসে জীবনের সময় ও আমলের মূল্য প্রকাশ পেয়েছে।
শ্রেষ্ঠ মানুষের পরিচয় : মানুষের জীবনের গড়-সময়; শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য- এ সীমার মধ্যেই আবর্তিত। এ হিসেবে বলা যায়, জীবন এক সংক্ষিপ্ত যাত্রা, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। এ কথা মানুষকে দুনিয়ার চাহিদা আর আখেরাতের আমলের মধ্যে ভারসাম্য রাখার শিক্ষা দেয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানোর গুরুত্ব বোঝায়, কারণ সময় সীমিত। সুযোগ একবার হাতছাড়া হলে আর ফিরে আসে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ সে, যার জীবন দীর্ঘ হয় ও আমল ভালো হয়। আর সবচেয়ে খারাপ মানুষ সে ব্যক্তি, যার জীবন দীর্ঘ হয়, কিন্তু আমল মন্দ হয়।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৩৩০)। (১৭-০৭-১৪৪৬ হিজরি মোতাবেক ১৭-০১-২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- আবদুল কাইয়ুম শেখ)।