ঢাকা রোববার, ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

মাহে রমজানে নবীজির আমল

দিদার শফিক
মাহে রমজানে নবীজির আমল

সাহরি গ্রহণ : জীবনে সবকিছুতেই প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর। তিনি প্রাচুর্যময় জীবন যাপন করার সুযোগ থাকার পরেও সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। খাদ্যবস্ত্র সবকিছুতেই ছিল তার সারল্যের ছাপ। তিনি সাধারণ খাবার দিয়ে সাহরি করতেন। ঘরে যখন যা থাকত তা দিয়েই সাহরি গ্রহণ করতেন। সাহরির জ্বন্য আলাদাভাবে কোনো আয়োজ্বন করতেন না। সাহরি গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি ভোজ্বনবিলাস ছিলেন না। রোজা রাখতে হবে, আল্লাহর আদেশ পালন করতে হবে- তাই সাহরি খেতেন। হাদিস থেকে সাহরির গ্রহণের বিষয়ে তার বিশেষ কোনো পছন্দের কথা জানা যায়নি। তবে তিনি সাহরিতেও খেজুর খাওয়া পছন্দ করতেন। হজ্বরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘উত্তম সাহরি খেজুর এবং উত্তম তরকারি সিরকা। আল্লাহতায়ালা সাহরি গ্রহণকারীদের প্রতি দয়া করুন।’ (কানজুল উম্মাল : ২৩৯৮৩)।

নবী কারিম (সা.) সাহরি খেতেন রাতের শেষ ভাগে সুবহে সাদিকের আগ মুহূর্তে। হজ্বরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.) বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাহরি খেতাম, এরপর তিনি সালাতের জ্বন্য দাঁড়াতেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফজ্বরের আজান ও সাহরির মাঝে কতটুকু ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, পঞ্চাশ আয়াত (পাঠ করা) পরিমাণ। (বোখারি : ১৯২১)।

মাসয়ালা শিক্ষাদান : সাহরির পর যখন ফজ্বরের আজান হতো, নবী কারিম (সা.) নামাজ্ব আদায় করে নিতেন। দিনের আলো ফুটলে সাহাবিদের রমজান ও রোজাসংক্রান্ত মাসআলা শিক্ষা দিতেন। হজ্বরত লাকিত বিন সাবিরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি কারিম (সা.) বলেন, তোমরা ভালোভাবে নাকে পানি পৌঁছাও, তবে রোজা অবস্থায় নয়। অর্থাৎ রোজা অবস্থায় হালকাভাবে পানি পৌঁছাও, অতিরঞ্জন করো না। (আবু দাউদ : ২৩৬৩)। নবী (সা.) সাহাবিদের রমজান সম্পর্কে সতর্কবাণী শোনাতেন। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসুল (সা.) বলেছেন, ওই ব্যক্তি ধুলোয় ধূসরিত হোক, যার কাছে আমার নাম উল্লিখিত হলো; কিন্তু সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করেনি। ওই ব্যক্তি ধুলোয় ধূসরিত হোক, যার কাছে রমজান মাস এলো অথচ তার গোনাহ মাফ হওয়ার আগেই তা অতিবাহিত হয়ে গেল। ওই ব্যক্তি ধুলোয় ধূসরিত হোক, যার কাছে তার বাবা-মা বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলো; কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়নি (সে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে জান্নাত অর্জ্বন করেনি)। (তিরমিজি : ৩৫৪৫)।

নবীজির ইফতার : রোজাদারের জ্বন্য ইফতার বড় আনন্দের। হাদিসে বলা হয়েছে, রোজাদারের জ্বন্য দুটি আনন্দ-একটি ইফতারের সময় ও অপরটি যখন আল্লাহর সঙ্গে মিলবে তখন। (বোখারি : ১৯০৪)।

ইফতারে সুন্নত : খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। কারণ নবী (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা রাসুল (সা.)-এর অভ্যাস ছিল। আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘নবি (সা.) নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত, তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকত তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে।’ (তিরমিজি; রোজা অধ্যায় : ৬৩২)। আজানের পর ইফতার করতে দেরি না করা নবী (সা.)-এর সুন্নত। বিভিন্ন হাদিস থেকে ও সাহাবিদের আমল থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন- সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যতদিন মানুষ দেরি না করে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (বোখারি : ১৮২১)।

তাহাজ্জুদ নামাজ্ব : রাসুল (সা.) সবসময় তাহাজ্জুদের নামাজ্ব পড়তেন। রমজানে আরও বেশি পড়তেন। রমজানে তিনি কখনো তাহাজ্জুদ পড়া ত্যাগ করতেন না। রাতের শেষ অংশে তিনি সাধারণত তাহাজ্জুদের নামাজ্ব পড়তেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) রমজান মাসে ও অন্য সব মাসের রাতে ১১ রাকাতের চেয়ে বেশি সালাত আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এ চার রাকাত আদায়ের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। এরপর তিন রাকাত আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি বেতর নামাজ্ব আদায়ের আগে ঘুমিয়ে পড়েন? নবী (সা.) বললেন, আমার চোখ ঘুমায়, আমার অন্তর ঘুমায় না।’ (বোখারি : ৩৫৬৯)।

তারাবি নামাজ্ব আদায় : রমজান মাসে নবী (সা.) এশার নামাজের পর অন্য সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত যে নামাজ্ব পড়তেন তাই মূলত তারাবি নামাজ্ব। নবীজি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাব তথা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে তারাবি নামাজ্ব আদায় করবে তার বিগত গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বোখারি : ২০০৯)।

দান-সদকাহ : রমজান দানের মাস। আমলের মাস। সাহায্য ও সহযোগিতার মাস। রাসুল (সা.) এর আমল থেকে বোঝা যায়, তিনি রমজানে অধিক পরিমাণে দান করতেন। রমজান মাস এলে তার দানের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যেত। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। রমজান মাসে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে কল্যাণবহ মুক্ত বায়ুর চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। (বোখারি : ৩২২০)।

কোরআন তেলাওয়াত : নবী (সা.) সব সময়ই কোরআন তেলাওয়াত করতেন। আর মাহে রমজানে তিনি অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করতেন। কারণ রমজান মাসেই আল্লাহতায়ালা কোরআন নাজিল করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, যা মানবজাতির জ্বন্য হেদায়েতের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। অতএব, তোমাদের যে এ মাস লাভ করবে, সে যেন তাতে অবশ্যই রোজা রাখে। (সুরা বাকারা : ১৮৫)। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রমজান এলে প্রতি রাতে নবী (সা.)-এর কাছে জিবরাইল (আ.) আগমন করতেন। একে অপরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন।’ (বোখারি : ৩৫৫৪)।

ইতেকাফ : নবী (সা.) প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। আম্মাজান হজ্বরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, নবী (সা.) ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। নবীজির পর তার স্ত্রীরাও ইতেকাফ করতেন। (মুসলিম : ১১৭২)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত