ঢাকা শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

মদিনা শরিফের খুতবা

জাকাত মানবকল্যাণের অনন্য মাধ্যম

শায়খ ড. আলি আবদুর রহমান আল-হুযাইফি
জাকাত মানবকল্যাণের অনন্য মাধ্যম

মানুষের প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা তার সৃষ্টিকর্তার কাছে তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন সে আল্লাহর ইবাদত করে ও সৃষ্টির প্রতি সদয় হয়। সে যদি কল্যাণের দিকে ঝুঁকে, উন্নত মর্যাদায় পৌঁছাতে চায় এবং অকল্যাণ ও বিপদ থেকে রক্ষা পেতে চায়, তাহলে তার উচিত আল্লাহর হক আদায় করা ও তার বান্দাদের উপকার করা। যখন মানুষ আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত থাকে ও অন্যদের উপকারে পিছিয়ে থাকে, তখন সে শাস্তি ও বিপদের মুখে পড়ে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তার প্রিয় মোমিনদের এমনই গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, যারা আল্লাহর হক আদায় করে ও মানুষের উপকারে আসে। আল্লাহতায়ালা বলেন, মোমিন নর ও মোমিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে; এদেরকেই আল্লাহ কৃপা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তওবা : ৭১)।

এছাড়াও মহান আল্লাহ সেই নেককার মোমিনদের প্রশংসা করেছেন, যারা জান্নাতের সর্বোত্তম স্থানে থাকবে। তিনি বলেছেন, ‘তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করত নিদ্রায়, রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। আর তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’ (সুরা যারিয়াত : ১৭-১৯)। মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে আর যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন; আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে আর নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে পাপ ক্ষমা করবে? তারা যা করে ফেলে, জেনে-শুনে তার পুনরাবৃত্তি করে না। এরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা আর জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম!’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৪-১৩৬)।

জাকাতের গুরুত্ব ও উপকারিতা : জাকাত হলো এক ফরজ ইবাদত, যা মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারিত। এটি বিশেষভাবে মুসলমানদের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রয়োজন মেটানোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, এটি জাকাতকে ইসলামের স্তম্ভগুলোর একটি বানিয়েছে। একজন মুসলিম যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জাকাত আদায় করে, তখন সে মহা প্রতিদান লাভ করে। একেকটি সৎকর্মের বিনিময়ে অন্তত দশগুণ, এমনকি সাতশো গুণ কিংবা আরো বেশি প্রতিদান পেতে পারে। জাকাত ধন-সম্পদকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে, বরকত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দূর করে ও দরিদ্রদের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। জাকাত গ্রহণকারীরা ধনী ব্যক্তির জন্য দোয়া করে, যা সম্পদের বরকত বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম।

এছাড়া জাকাত মানুষের অন্তরকে কৃপণতা ও লোভ থেকে পরিশুদ্ধ করে, যা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃপণতা ও লোভ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় ও দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত করে তোলে। অতীতের বহু জাতি এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। হজরত জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অত্যাচার করা থেকে বিরত থাক। কেননা কেয়ামত দিবসে অত্যাচার অন্ধকারে পরিণত হবে। তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান হও। কেননা, এ কৃপণতাই তোমাদের আগেকার কওমকে ধ্বংস করেছে। এ কৃপণতা তাদের খুন-খারাবি ও রক্তপাতে উৎসাহ যুগিয়েছে এবং হারাম বস্তুগুলোকে হালাল জ্ঞান করতে প্রলোভন দিয়েছে।’ (মুসলিম : ৬৪৭০)।

জাকাত সমাজ থেকে ঈর্ষা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা দূর করে এবং দয়া, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। আল্লাহ ধনী ব্যক্তিদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা গরিবদের মাঝে বণ্টন করা হয়। আল্লাহর বিধানে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে, যাতে একে অপর থেকে উপকৃত হতে পারে। সমাজের সুষ্ঠু ভারসাম্য বজায় থাকলে মানুষ ভালো থাকে। ইসলাম প্রতিটি মানুষের অধিকার নির্ধারণ করেছে, দুস্থদের সাহায্য করেছে, অভাবীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ও সমাজের দুর্বলদের সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছে। এভাবে ইসলাম সমাজে এমন একটি সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে কেউ অপমানিত বা অবহেলিত অনুভব না করে। যদি মুসলমানরা ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে চলে, তাহলে ধ্বংসাত্মক মতবাদ বা অন্যায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি জাহিলি যুগের বিধি-বিধান কামনা করে? নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্যে বিধানদানে আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর?’ (সুরা মায়েদা : ৫০) জাকাত আল্লাহর নির্ধারিত হক, যা গরিব-দুঃখী, জাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী, নতুন মুসলিম, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের সাহায্যে, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। জাকাত আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে এমন কাউকে দেওয়া যায় না, যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব জাকাতদাতার ওপর রয়েছে। (যেমন : বাবা-মা বা সন্তান)।

জাকাত দেয়ার নিয়ম : জাকাত দিতে হয় স্বর্ণ, রুপা, গবাদিপশু, ব্যবসার পণ্য, শস্য, খনিজ ও ভূ-সম্পদ থেকে। স্বর্ণের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ (নিসাব) হলো ২০ মিসকাল (প্রায় ৮৫ গ্রাম), যা সৌদি স্বর্ণমুদ্রায় ১১ ও ৩/৭ দিরহাম সমান। রুপার নিসাব ২০০ দিরহাম, যা প্রায় ৫৬ সৌদি রিয়াল মূল্যের সমান। সব ক্ষেত্রে জাকাতের হার ১/৪০ (২.৫%), অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় ২.৫ টাকা জাকাত দিতে হয়। যদি কোনো মুসলিম তার সম্পদের ২.৫% জাকাত আদায় করে, তাহলে সে জাকাত আদায়ের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়। গবাদি পশুর জাকাতের ক্ষেত্রে ৫টি উট হলে ১টি ছাগল জাকাত দিতে হবে। ৩০টি গরু হলে এক বছরের একটি বাছুর দিতে হবে। ছাগল বা ভেড়া ৪০টি হলে ১টি ছাগল দিতে হবে। যদি এসব পশু ঘাসভিত্তিক খাদ্যে পালিত হয়, তাহলে সংখ্যারভিত্তিতে জাকাত বৃদ্ধি পাবে, যা বিস্তারিতভাবে ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে।

ব্যবসায় জাকাত : ব্যবসার জাকাত হলো, বছর শেষে তার বাজারমূল্য নির্ধারণ করে ২.৫% দিতে হবে। অনুরূপভাবে শস্য ও ফলমূলের জাকাত হলো, প্রাকৃতিক বৃষ্টির পানিতে উৎপাদিত হলে ১০% জাকাত দিতে হবে। যদি কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়, তাহলে ৫% দিতে হবে। শস্যের জন্য ন্যূনতম পরিমাণ ৬০ সা’ (প্রায় ৬১৩ কেজি) হলে জাকাত ফরজ হয়। আর খনিজ সম্পদ, তেল ও গ্যাস উত্তোলন থেকে ৫% যাকাত দিতে হবে।

জাকাতের বিধান জানা জরুরি : প্রত্যেক মুসলিমের উচিত আলেমদের কাছ থেকে জাকাতের সঠিক বিধান জেনে নেয়া, যাতে সে দায়িত্বমুক্ত হতে পারে ও তার সম্পদ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায়। যে ব্যক্তি জাকাত দিতে গাফিলতি করে, তার সম্পদ দুনিয়া ও আখেরাতে তার জন্য শাস্তির কারণ হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন বিমুগ্ধ না করে; আল্লাহ তো এটা দিয়েই তাদের পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান; তারা কাফের থাকা অবস্থায় এদের আত্মা দেহত্যাগ করবে।’ (সুরা তাওবা : ৮৫)

জাকাত না দেয়ার পরিণতি : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সোনা-রুপার অধিকারী যেসব লোক জাকাত আদায় করে না, কেয়ামতের দিন তার ঐ সোনা-রুপা দিয়ে তার জন্য আগুনের অনেক পাত তৈরি করা হবে, অতঃপর তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে কপালদেশ, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেয়া হবে। যখনই ঠান্ডা হয়ে আসবে পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। এরূপ করা হবে এমন একদিন যার দৈর্ঘ্য হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। আর তার এরূপ শাস্তি লোকদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। অতঃপর তাদের কেউ পথ ধরবে জান্নাতের আর জাহান্নামের দিকে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! উটের মালিকের কী অবস্থা হবে? তিনি বললেন, যে উটের মালিক তার উটের জাকাত আদায় করবে না কেয়ামতের দিন তাকে এক সমতল ময়দানে উপুড় করে ফেলা হবে। অতঃপর তার উটগুলো মোটাতাজা হয়ে আসবে। এর বাচ্চাগুলোও এদের অনুসরণ করবে। এগুলো আপন আপন খুর দ্বারা তাকে পায়ে মাড়াতে থাকবে ও মুখ দ্বারা কামড়াতে থাকবে। এভাবে যখন একটি পশু তাকে অতিক্রম করবে তখন অপরটি অগ্রসর হবে। সারাদিন তাকে এরূপ শাস্তি দেয়া হবে। এ দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর বান্দাদের বিচার শেষ হবে। তাদের কেউ জান্নাতের দিকে আর কেউ জাহান্নামের দিকে পথ ধরবে।

অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! গরু-ছাগলের মালিকদের কী অবস্থা হবে? উত্তরে তিনি বললেন, যেসব গরু ছাগলের মালিক এর জাকাত আদায় করবে না কেয়ামাতের দিন তাকে এক সমতল ভূমিতে উপুর করে ফেলে রাখা হবে। আর তার সে সব গরু ছাগল তাকে শিং দিয়ে আঘাত করতে থাকবে এবং খুর দিয়ে মাড়াতে থাকবে। সেদিন তার গরু বা ছাগলের শিং বাঁকা বা ভাঙ্গা থাকবে না এবং তাকে মাড়ানোর ব্যাপারে একটিও অনুপস্থিত দেখতে পাবে না। যখন এদের প্রথমটি অতিক্রম করবে দ্বিতীয়টা এর পিছে পিছে এসে যাবে। সারাদিন তাকে এভাবে পিষা হবে। এ দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর বান্দাদের বিচার শেষ হবে এবং তাদের কেউ জান্নাতের দিকে আর কেউ জাহান্নামের দিকে পথ ধরবে।’ (মুসলিম : ২১৮০)। (১৪-০৯-১৪৪৬ হিজরি মোতাবেক ১৪-০৩-২০২৫ ঈসায়ি তারিখে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন - আবদুল কাইয়ুম শেখ)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত