দোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রত্যেক নবী রাসুল এই ইবাদত করেছেন। যুগে যুগে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করেছেন। বিপদণ্ডআপদ থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তারা সবাই দোয়ার সুফল নগদ প্রাপ্ত হয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে একটি করে কবুল দোয়ার অধিকার দেয়া হয়েছিল আর প্রত্যেক নবী (দুনিয়াতে) সে দোয়া করেছেন এবং তা কবুলও হয়েছে; কিন্তু আমি আমার দোয়াকে কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য রেখে দিয়েছি। (বোখারি : ৫৮৬৬) কোরআনে নবীদের দোয়ার ভাষাগুলো বর্ণিত হয়েছে। নির্বাচিত কয়েকজন নবীর নির্বাচিত কয়েকটি দোয়া এখানে উল্লেখ করা হলো।
হজরত আদম (আ.)-এর দোয়া : আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও তার স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর জন্য জান্নাতকে বাসস্থান বানানো হয়েছিল। নেয়ামতের প্রাচুর্যের মধ্যে থেকে তারা শয়তানের কুমন্ত্রণায় ঐতিহাসিক ভুল করে বসে। তখন তাদের জান্নাতের অপূর্ব নেয়ামত ও পোশাক থেকে বঞ্চিত করা হয়। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, হজরত আদম (আ.) বলেছিলেন, হে আমার রব! আমার তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার কোন উপায় আছে কি? উত্তরে আল্লাহপাক বলেন, হ্যাঁ! আছে। তাদের ক্ষমা প্রার্থনার বাক্যগুলো শিখিয়ে দেয়া হয়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, রব্বানা জলামনা আনফুসানা, ওয়া ইনলাম তাগফির লানা, ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খসিরীন। অর্থ : হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো ও দয়া না করো, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।? (সুরা আরাফ : ২৩)।
হজরত নূহ (আ.)-এর দোয়া : হজরত নূহ (আ.) দীর্ঘ ৯৫০ বছর তার কওমকে দ্বীনের দাওয়াত দেন। কিন্তু অল্প কিছু লোক ছাড়া কেউ ঈমান আনেনি। কাফেররা দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে তাকে ভীতি প্রদর্শন করত। পাগল আখ্যায়িত করে ঠাট্টা বিদ্রুপ করত। তিনি যখন তাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হলেন এবং বুঝতে পারলেন, তাদের সীমালংঘনের শাস্তি অবধারিত তখনই তিনি কুফরের শেকড় নির্মূল করার জন্য দোয়া করেছিলেন, রব্বি লা তাজার আলাল আরদি মিনাল কাফিরীনা দাইয়ারা। ইন্নাকা ইন তাজারহুম ইউদিল্লু ইবাদাকা, ওয়া লা ইয়ালিদু ইল্লা ফাজিরান কাফফারা। অর্থ: হে আমার রব! আপনি পৃথিবীতে কোনো কাফেরকে বসবাসকারী হিসেবে রেহাই দেবেন না। নিশ্চয়ই যদি আপনি তাদেরকে রেখে দেন, তাহলে তারা আপনার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করবে এবং তারা শুধুই পাপাচারী ও কাফের সন্তান জন্ম দেবে। (সুরা নূহ : ২৬-২৭)।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া : হজরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ একজন নবী ও রাসুল। কুফর, শিরক ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তিনি একাই সংগ্রাম করেছেন। আত্মত্যাগ, তাওহিদের প্রচার ও পারিবারিক দায়িত্বে? তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ দোয়া কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। একটি দোয়ায় তিনি নিজের পাশাপাশি সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঈমান ও নেক আমলের জন্য দোয়া করেছেন। তিনি বলেছেন, রব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুর্রিয়াতি, রব্বানা ওয়াতাকাব্বাল দুআ । অর্থ : হে আমার রব! আমাকে সালাত কায়েমকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও। হে আমাদের রব! আর আমার দোয়া কবুল করুন । ( সুরা ইবরাহিম : ৪০)
হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া : ইউনুস (আ.) তার জাতিকে ঈমানের দিকে বারংবার আহ্বান করেন কিন্তু তারা তার দাওয়াত গ্রহণ করেনি। উল্টো তাকে অত্যাচার করা শুরু করে। এর ফলে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে শহর ছেড়ে চলে যান। যাওয়ার সময় সমুদ্রে তার নৌকাটি ডুবে যায় এবং একটি বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলে। তখন তিনি আল্লাহর কাছে তওবা করেন। সাহায্য প্রার্থনা করেন। বর্ণিত হয়েছে, আর মাছওয়ালা (ইউনুস (আ.) এর কথা স্মরণ করো! যখন তিনি ক্রোধান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে, আমি তার ওপর কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র! নিঃসন্দেহে আমি অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা আম্বিয়া : ৮৭)। সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুননুন (মাছ ওয়ালা) ইউনুস (আ.) মাছের পেটে দোয়া করেছিলেন, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জলিমীন। কোন মুসলিম যখনই এই দোয়া করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করে থাকেন। (তিরমিজি : ৩৫০৫)।
হজরত শুয়াইব (আ.)-এর দোয়া : মাদাইয়ানবাসীর নিকট হজরত শুয়াইব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি তার কওমকে বললেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তোমরা পরিমাপ ও ওজন ঠিকভাবে দিও। আল্লাহর প্রতি যারা ঈমান আনে, তাদের আল্লাহর পথে বাধা দিও না। তখন তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক ও অতি দুরাচার নেতৃবর্গ বলল, হে শুয়াইব! তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে না আসলে আমরা তোমাদের জনপদ থেকে অবশ্যই বহিষ্কার করে দেব। তখন হজরত শুয়াইব (আ.) আল্লাহপাকের সাহায্য প্রর্থনা করে বললেন, রব্বানাফতাহ বাইনানা ওয়া বাইনা কওমিনা বিলহাক্কি, ওয়ানতা খাইরুল ফাতিহীন। অর্থ : হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের অপরাধীদের মধ্যে ন্যায্যভাবে মীমাংসা করে দিন এবং আপনিই মীমাংসাকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (সুরা আরাফ : ৮৯)।
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর দোয়া : হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন একজন মহান নবী। তিনি হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র। তার জীবনী কোরআনের সুরা ইউসুফে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর সারাংশ হলো- ইউসুফ (আ.) কে তার ভাইয়েরা কেনআনের কূপে ফেলে দিয়েছিল। আল্লাহ পাক তাকে কূপ থেকে উদ্ধার করে মিসর নিয়ে গেলেন। মিসরে এক মিথ্যা অপবাদে তাকে কারাগারে যেতে হয়। আল্লাহতায়ালা তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে মিসরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে দিলেন। পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর তার সাক্ষাৎ হলো।
তিনি ইহকালীন জীবনে সর্বদিক থেকে আল্লাহ পাকের রহমত ও নেয়ামত লাভ করার পর জীবন সায়েহ্নে এসে আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করলেন, (অর্থ:) হে আমার রব, আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! আপনিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (সুরা ইউসুফ : ১০১)।