রমজান অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। রমজান মাস ছিল ইবাদতের বসন্তের মাস। নেক আমল ও তাকওয়ার পাথেয় অর্জনের মৌসুম। রমজান মাসে নেক আমল ও তাকওয়ার উপর চলার অনুশীলন করে বছরব্যাপী সে মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হলো সেই যে রমজানের পরেও বছরব্যাপী রমজানের আমলগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। নিজের জীবনকে পরিবর্তন করেছে। আমরা সারা বছর কীভাবে আমরা রমজানে কৃত আমলগুলোর ধারাবাহিকতা চালু রাখতে পারি সে বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।
রোজার ধারাবাহিকতা : রমজানের রোজা শেষ হলেও অবশিষ্ট মাসগুলোতে বহু নফল রোজা রয়েছে। আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী সেসব রোজা রাখার চেষ্টা করতে পারি। যাদের জীবনে অধিক রোজার আমল পাওয়া যাবে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে জান্নাতের রাইয়ান দরজা দিয়ে প্রবেশের সৌভাগ্য দান করবেন।
কোরআন তেলাওয়াতের ধারাবাহিকতা : রমজান মাসে আমাদের অনেকেই অধিক পরিমাণ কোরআন কারীম তেলাওয়াত করে থাকি। অনেকেই একটা টার্গেট করে নেই এই রমজানে এত খতম দিব, এতটুকু মুখস্থ করব। অধিক পরিমাণ তেলাওয়াত করার এটা একটা ভালো পদ্ধতি। আমরা রমজানের পরে সারা বছরই রমজানের মতো একটা টার্গেট করে কোরআন খতম দেয়া ও মুখস্থ করা ও কোরআন বুঝে বুঝে অধ্যয়ন করার ধারাবাহিকতা জারি রাখতে পারি।
নফল নামাজের ধারাবাহিকতা : রমজান মাসে আমরা রাতে তারাবীহ পড়ি। রাতে লম্বা সময় নামাজে দাঁড়িয়ে থাকি ও অধিক পরিমাণে নফল নামাজ আদায় করে থাকি। এখন রমজানের তারাবীহ না থাকলেও আমরা বছরব্যাপী কিয়ামুল লাইল, তাহাজ্জুদ পড়তে পারি। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সারা বছর রাতে কিয়ামুল লাইল করতেন। তাই আমরা নিজেদের জীবনে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই পবিত্র এই সুন্নাহকে জিন্দা রাখতে পারি। কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের গুরুত্ব ও ফজিলত প্রসঙ্গে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম (নফল) নামাজ হলো, রাতের নামাজ তথা তাহাজ্জুদ। (মুসলিম : ১১৬৩)।
জিকিরের ধারাবাহিকতা : হাদিস শরিফে বর্ণিত বিভিন্ন সময় ও মুহূর্তে পঠিতব্য মাছূর দোয়া ও জিকির, নামাজের পরে ও সকাল-সন্ধ্যার ফজিলতপূর্ণ তাসবীহ ও জিকিরসমূহ নিয়মিত পাঠ করা।
দোয়ার ধারাবাহিকতা : দোয়া মোমিনের জীবনের অনেক বড় হাতিয়ার। দোয়ার মাধ্যমে সে আল্লাহর নিকট থেকে সবকিছুই আদায় করে নিতে পারে। আর দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি শুধু রমজানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যে ব্যক্তির অধিক পরিমাণে দোয়া, দরুদ ও ইস্তেগফারের অভ্যাস থাকবে তার জীবন অনেক সুন্দর হবে ইনশা আল্লাহ।
দান-সদকার ধারাবাহিকতা : রমজানে জাকাত, সাদাকাতুল ফিতর আমল শেষ হলেও সারা বছর নফল দান-সদকার আমলের দ্বার উন্মুক্ত। দান-সদকা রমজানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গোটা বছরই এর সময় এবং তা সবসময়ই ফজিলতপূর্ণ আমল। অতএব সামর্থ্য অনুযায়ী সারা বছরই দান-সদকার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান-সদকা সম্পদ হ্রাস করে না। ( মুসলিম : ২৫৮৮)। অন্য এক হাদিসে আছে, দানকারীর জন্য ফেরেশতারা প্রতিদিন সম্পদ বৃদ্ধির দোয়া করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! সম্পদ ব্যয়কারীকে (দানকারীকে) তার বদলা (আরো সম্পদ) দাও। অন্যজন বলেন, হে আল্লাহ! (দান না করে) যে সম্পদ ধরে রাখে তার সম্পদ ধ্বংস করে দাও। (বোখারি : ১৪৪২)।
মেহমানদারী করার ধারাবাহিকতা : আমরা রমজান মাসে রোজাদারকে ইফতারি করিয়ে থাকি। অন্য মাসের তুলনায় রমাজা?নে অন্যকে মেহমানদারী করানো, খাবার দেয়ার মতো মহৎ কাজটির চর্চা বেশি করে থাকি। এর দ্বারা অন্যের প্রতি সমবেদনা ও সহম?র্মিতার চর্চা হয়। যা মোমিনের বিশেষ গুণ। এটা আল্লাহর পছন্দনীয় একটি আমল। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকীন, ইয়াতীম ও ব›ন্দিদেরকে খাবার দান করে। (সুরা দাহর : ৮)। আমরা এ গুণ?টির চর্চা আমরা সারা বছ?রই করতে পারি। আসুন, রমজানের আমলগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজের জীবনকে পরিবর্তন করে সৌভাগ্যবানদের কাতারে শামিল হই। আল্লাহতায়ালা তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী: মাস্টার্স (তামহীদি), হাদিস ও উলুমুল হাদিস ডিপার্টমেন্ট, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, মিশর